কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
ভূপ্রকৃতিকে অস্বীকার করার ফল মিলল হাতেনাতেই। দার্জিলিং জেলায় বালাসন নদীর উপরে অস্থায়ী ভাবে যে ‘হিউম পাইপ’ ব্রিজটি তৈরি হয়েছিল ২০২৫–এ, ভারী বৃষ্টির প্রথম ধাক্কাতেই সেটি ধুলিস্যাৎ হলো। উত্তরবঙ্গের ভূপ্রকৃতি ও ধস বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, মহানন্দা নদী, তার উপনদী বালাসন এবং গোটা মহানন্দা অববাহিকা সম্পর্কে না জেনে ব্রিজ তৈরির যা পরিণতি হওয়ার কথা ছিল, সেটাই হয়েছে। আগামী দিনে ওই জায়গায় যদি ফের হিউম পাইপ ব্রিজ তৈরি হয়, তা হলে আবার একই পরিণতি হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন ভূবিজ্ঞানীরা।
১৯৬৫–তে বালাসন নদীর উপরে তৈরি দুধিয়া–মিরিক ব্রিজটি নানা ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় সামলে টিকে ছিল প্রায় ৬০ বছর। ২০২৫–এর অক্টোবরে উত্তরবঙ্গের ভয়াবহ হড়পা বানে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ব্রিজটি। তৎকালীন রাজ্য সরকার ওই জায়গায় তড়িঘড়ি একটি অস্থায়ী ‘হিউম পাইপ’ ব্রিজ তৈরি করে। এই ব্রিজটির আয়ু ছিল মাত্র আট মাস। এই জুনে উত্তরবঙ্গে ভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ার প্রথম ধাক্কাও সামলাতে পারল না সেতুটি। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পাহাড়ি নদীর ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত বা ত্রুটিপূর্ণ রিভার ইঞ্জিনিয়ারিং যে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে, শুক্রবারের ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় নজির। বালাসনের মতো দ্রুতগামী পাহাড়ি নদীর উপরে সেতু বা অন্য কোনও কাঠামো নির্মাণের সময়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি বহনের ক্ষমতা এবং চরম বন্যার সম্ভাবনাকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়েই যে অস্থায়ী সেতুটি তৈরি করা হয়েছিল, প্রকৃতি তার প্রমাণ দিয়েছে।
৪৬৮ মিটার দীর্ঘ দুধুয়া–মিরিক সেতুর ধসের ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, সেতুর একাধিক পিলার এবং তুলনামূলক ভাবে নিচু কংক্রিটের কাঠামো নদীর প্রবাহপথকে অনেকটাই সঙ্কুচিত করে দিয়েছিল। ফলে সেতুর নীচের অংশ অনেকটা সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ বা ‘বটলনেক’-এর মতো আচরণ করছিল। এই প্রসঙ্গে সিধো–কানহু–বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক এবং হিমালয় অঞ্চলের ভূমিধস বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিৎ বেরা বলছেন, ‘মহানন্দার অববাহিকাটি ফানেল–আকৃতির। ফলে পাহাড়ে বৃষ্টি হলে বিপুল পরিমাণে জল অত্যন্ত উচ্চ বেগে এই অঞ্চলের নদীগুলো দিয়ে নেমে আসে। সেই সঙ্গে আসে বোল্ডার, গাছের গুঁড়ি ও বিপুল পলি। সেতুর পিলারগুলো নদীর প্রবাহপথকে সঙ্কুচিত করায় জলপ্রবাহের উপরে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, পিলারের চারপাশে তীব্র ক্ষয় (স্কারিং) শুরু হয়, ভাসমান গাছের গুঁড়ি পিলারে আটকে জলপ্রবাহকে আরও বাধাগ্রস্ত করে এবং সেতুর উপর ও নীচে জলস্তরের পার্থক্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়।’
যদিও অধ্যাপক জানাচ্ছেন, সেতু ধসের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে হলে রিভার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে তদন্ত, নকশা, প্রবাহের পরিমাপ, পিলারের ভিত্তির অবস্থা এবং বন্যার সময়কার জলবিদ্যাগত তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তাই ‘ত্রুটিপূর্ণ রিভার ইঞ্জিনিয়ারিং–ই একমাত্র কারণ’ — এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কিন্তু পাহাড়ি নদীতে অপর্যাপ্ত জলপ্রবাহ-ক্ষমতা, অতিরিক্ত পিলার, কম ক্লিয়ারেন্স এবং পলি-পরিবহণের বিষয়টি উপেক্ষা করলে বর্ষা ও আকস্মিক বন্যার সময়ে পরিস্থিতি যে বিশেষ ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে — সে বিষয়টি তিনি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন।
ভূপ্রকৃতিগত কারণের জন্যই উত্তরবঙ্গে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি এত বেশি বলে জানাচ্ছেন ভূতত্ত্ববিদরা। ফানেল-আকৃতির অববাহিকা, খাড়া ও দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, বনভূমি ধ্বংস এবং অতি ভারী বৃষ্টিপাত — এই চারটি কারণ একসঙ্গে মিলেই উত্তরবঙ্গের উপ-হিমালয় অঞ্চলকে, বিশেষ করে মহানন্দা ও বালাসন নদী অববাহিকাকে ভয়াবহ হড়পা বানের আদর্শ পরিস্থিতিতে পরিণত করেছে। বালাসন ও মহানন্দা — দুই নদীরই উৎপত্তি দার্জিলিং হিমালয়ের সংকীর্ণ ও পাহাড়-বেষ্টিত অঞ্চলে। পরে তারা শিলিগুড়ির কাছাকাছি অঞ্চলে এসে সমভূমিতে মেশে।
এই ভূ-প্রাকৃতিক বিন্যাসের জন্যই পাহাড় থেকে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির জল দ্রুত সংকীর্ণ নিম্নপ্রবাহে কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে নদীতে জলস্তর বিপজ্জনক ভাবে বেড়ে যায়। সেই প্রবাহ কোনও ভাবে বাধা পেলেই ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে।
দুধিয়া–মিরিক ব্রিজে এমনটাই ঘটেছিল।