আইআইটি-আইআইএম থেকে মেট্রো, চা থেকে পর্যটন উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে জোর বিজেপি সরকারের বাজেটে
দৈনিক স্টেটসম্যান | ২৩ জুন ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে উত্তরবঙ্গকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গত প্রায় এক দশক ধরে নির্বাচনী লড়াইয়ে উত্তরবঙ্গকে পাশে পেয়েছে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতায় আসার পরই উত্তরবঙ্গের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন দেখা গেল এবারের বাজেটে।
বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত উত্তরবঙ্গের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, যোগাযোগ, পর্যটন ও চা শিল্পের উন্নয়নে একাধিক বড় প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ বলে দাবি সরকারের।
বিধানসভা নির্বাচনের আগে পূর্বতন সরকারের অন্তর্বর্তী বাজেটে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ছিল ৯২০.১৩ কোটি টাকা। নতুন বিজেপি সরকারের অর্থবর্ষে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে বরাদ্দ হয়েছে ১,৮১২.৫২ কোটি টাকা। বাজেটে চা শিল্পকে সুরক্ষা দিতে টি-ট্যুরিজমের জন্য চা বাগানের জমি ব্যবহারের সীমা ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।
পূর্বতন সরকারের আমলে চা বাগানের ৩০ শতাংশ জমি টি-ট্যুরিজমের জন্য ব্যবহারের যে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ ছিল। চা বাগান নষ্ট হওয়ার এবং জমি বেহাত হওয়ার যে আশঙ্কার কথা দীর্ঘকাল শোনা যাচ্ছিল, সেই সমস্যার সমাধানে বর্তমান সরকার টি-ট্যুরিজমের জন্য জমি ব্যবহারের সীমা ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা করেছে। অর্থমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে চা শিল্প বাঁচানোর পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহল। পাশাপাশি চা শ্রমিকদের কল্যাণে ‘প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিক প্রস্থান যোজনা’ চালুর কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
বাজেটে শিলিগুড়িতে ৫ হাজার কোটি টাকার আইটি হাব, উত্তরবঙ্গে একটি আইআইটি ও একটি আইআইএম, নতুন এইমস, ক্যান্সার হাসপাতাল, আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং ও দক্ষিণ দিনাজপুরে মেডিক্যাল কলেজ তৈরির কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ১১ হাজার কোটি টাকার তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের কথাও রয়েছে বাজেটে। উত্তরবঙ্গের ক্রীড়াক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য ২০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম ও ইনডোর স্টেডিয়ামের ঘোষণা করা হয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি মেট্রো প্রকল্পের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে সমীক্ষা শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি মালদহ ও দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটে দুটি বিমানবন্দর তৈরি হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া হাসিমারা এয়ার বেসের জন্য ২৫ একর জমি বরাদ্দ এবং কোচবিহার বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে।
পর্যটন ক্ষেত্রে দার্জিলিংকে ইকো-অ্যাডভেঞ্চার ও হেরিটেজ পর্যটনের আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ট্রেকিং, হাইকিং, র্যাফটিং, প্যারাগ্লাইডিংয়ের প্রসারেও নতুন সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ডুয়ার্সকে অরণ্য, বন্যপ্রাণী, উপজাতীয় পর্যটনের একটি কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে নতুন সরকার।
এছাড়া বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিং এবং ঐতিহ্যবাহী চা বাংলোর হেরিটেজ ম্যাপিংয়ের উদ্যোগও থাকবে। এছাড়া উত্তরবঙ্গের পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দাদের কথা মাথায় রেখে পাহাড়ি ঝোরাগুলির সংরক্ষণের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে নতুন সরকার। এর ফলে পাহাড়ি এলাকায় পানীয় জলের জোগান এবং জলভিত্তিক জীবিকায় সুবিধা হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাজেট নিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার জানান, দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে উত্তরবঙ্গ উন্নয়নের ধারা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল। তিনি দাবি করেন যে, এই বাজেটের মাধ্যমে সরকার সেই দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের ঘাটতি পূরণের কাজ শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, এই বাজেট ‘বিকশিত ভারত’ ও ‘বিকশিত বাংলা’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে।
সাংসদ রাজু বিস্তা আরও জানিয়েছেন, পাহাড়কে শক্তিশালী করা এবং মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণের যে সংকল্প এই বাজেটে ফুটে উঠেছে, তা উত্তরবঙ্গকে উন্নয়নের এক নতুন যুগে প্রবেশ করাবে। যেখানে পাহাড় ও সমতলের মানুষের প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা গুরুত্ব পাবে এবং একটি সামগ্রিক বিকাশের ছবি ফুটে উঠবে। পর্যটন থেকে শুরু করে কৃষি–প্রতিটি ক্ষেত্রকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সাজানো এই বাজেট উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে এক নতুন আশার আলো হয়ে উঠেছে।
নর্থ বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুরজিৎ পাল বলেন, ‘এই বাজেট উত্তরবঙ্গের জন্য লাভদায়ক। কর আদায় ও শিল্প বিনিয়োগের দিক দিয়ে যে সরলতা রাজ্য সরকার এনেছে তা প্রশংসনীয়। পাশাপাশি চা বাগান ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে তাকে স্বাগত জানাই।’ চা সংগঠনের প্রতিনিধিরা বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছেন। এই পরিকল্পনাগুলি উত্তরবঙ্গকে উন্নয়নের নতুন যুগে পৌঁছে দিতে পারে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও শিল্পক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে মত একাধিক মহলের।