বিহারের ভোজপুর জেলার পুলিশ এনকাউন্টার ঘিরে তুঙ্গে রাজনীতি। সমাজকর্মী, কনটেন্ট ক্রিয়েটার ভরত ভূষণ তিওয়ারির মৃত্যু ঘিরে বহু দূর গড়িয়েছে বিতর্কের জল। বন্যা, নদীভাঙন–সহ একাধিক স্থানীয় সমস্যার কথা তুলে ধরে ফেসবুকে কন্টেন্ট বানানো ২৮ বছর বয়সি যুবকের কী ভাবে পুলিশের এনকাউন্টারে মৃত্যু হলো, তা নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।
পুলিশের দাবি, তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে ভরত ভূষণ তিওয়ারির মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, ওই যুবক আত্মসমর্পণের পরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এই অভিযোগের পরে ভরতের মৃত্যু নিয়ে ব্যাপক শোরগোল শুরু হয়। বিহারের ভোজপুরের বাসিন্দা এই সমাজকর্মীর মৃত্যুর পরে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, জল গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত এবং শুরু হয়েছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত।
ভরত ভূষণ তিওয়ারি বিহারের ভোজপুর জেলার শাহপুর এলাকার বিলৌটি গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার বন্যা, নদী ভাঙন, উচ্ছেদ এবং স্থানীয় প্রশাসনিক সমস্যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব ছিলেন। ফেসবুককে তিনি নিয়মিতভাবে স্থানীয় ইস্যু তুলে ধরার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতেন। অনেক গ্রামবাসীর দাবি, সেই কারণেই এলাকায় তাঁর পরিচিতি ও প্রভাব তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন ক্ষেত্রে শাসকদল বিজেপির বিরুদ্ধে সুর চড়াতেও দেখা গিয়েছিল তাঁকে।
স্থানীয় কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার আগে ভরত সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পোস্ট করেছিলেন এবং সরকারি আধিকারিকদের উদ্দেশে হুমকিমূলক মন্তব্য করারও অভিযোগ ওঠে। পুলিশের দাবি, সেই সূত্র ধরেই তাঁর বিরুদ্ধে নজরদারি শুরু হয়েছিল।
সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর, ১৫ জুনের পরে ভারত তিওয়ারির কিছু পোস্ট প্রশাসনের নজরে আসে। সেখানে একটি পোস্টে ভরত দাবি করেছিলেন, বিহার সরকার তাঁকে এনকাউন্টারে মেরে ফেলতে পারে! তার পরদিনই ভরতকে ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ বলে দাবি করে পুলিশ। এর পরে ১৭ জুন তাঁকে ধরতে অভিযান চালায় পুলিশ। শাহপুরের একটি চাষের খেতে এনকাউন্টার করে শাহপুর পুলিশ ও তাদের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স!
সেই সময়ে পুলিশ দাবি করে, ভরতের কাছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ছিল এবং তিনি পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। আত্মরক্ষার জন্য পুলিশ পাল্টা গুলি চালায় এবং তিনি গুরুতর জখম হন। পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
এই এনকাউন্টারের কিছুক্ষণ আগের ফেসবুক লাইভ ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, ভরত ফাঁকা মাঠে দাঁড়িয়ে ক্যামেরার সামনে কিছু বলছেন। নিজের পিস্তল পুলিশ আধিকারিকদের দিকে ছুড়ে দিচ্ছেন তিনি।
পরিবারের বক্তব্যও পুলিশের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁদের অভিযোগ— ভরত তিওয়ারি আত্মসমর্পণ করেছিলেন এবং অস্ত্র ফেলে দিয়েছিলেন, তার পরেও তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এই দাবি সামনে আসার পর থেকেই ‘ফেক এনকাউন্টার’-এর অভিযোগ জোরালো হয়। ভরতের শেষ মুহূর্তে করা কিছু ভিডিয়ো দেখে স্থানীয়দের দাবি, ভরত তো আত্মসমর্পণই করেছিলেন, তা হলে নিরস্ত্র অবস্থায় তাঁকে গুলি করে মারা হলো কেন? তবে কি সরকারের বিরোধিতার কারণেই মরতে হলো তাঁকে?
এনকাউন্টারের পরে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত এক চিকিৎসকের দাবি অনুযায়ী, ভরত তিওয়ারির শরীরে চার থেকে পাঁচটি গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে আরও প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
ঘটনার পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়া, স্থানীয় সংগঠন এবং রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে— এটি কি সত্যিই বৈধ পুলিশি অভিযান ছিল, নাকি অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনা?
বিতর্ক বাড়তেই বিহার সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত হতে পারে। পাশাপাশি কয়েকজন পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে খবর। এ ছাড়া তদন্তের দায়িত্ব উচ্চপদস্থ কর্তাদের হাতে দেওয়া হয়েছে। বিহার পুলিশের তরফেও তদন্তে ‘গুরুতর ত্রুটি’ থাকার কথা স্বীকার করা হয়েছে বলে রিপোর্টে দাবি।
এই ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং সিবিআই তদন্তের দাবিতে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়। তবে শীর্ষ আদালত অবিলম্বে শুনানির আবেদন গ্রহণ করেনি, কিন্তু নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে পাটনা হাইকোর্টেও বিষয়টি নিয়ে আবেদন করা হয়েছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— ভরত তিওয়ারির মৃত্যু কি নিয়মমাফিক পুলিশি অভিযান, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও সত্যি রয়েছে? সেই উত্তর নির্ভর করছে তদন্ত রিপোর্ট ও আদালতের পর্যবেক্ষণের উপর।