চার ঘণ্টার ম্যারাথন ফুটবল! এমবাপে জাদুতে আবহাওয়া ও ইরাককে হারিয়ে নকআউটে ফ্রান্স
প্রতিদিন | ২৩ জুন ২০২৬
ফ্রান্স ৩ (এমবাপে ২, দেম্বেলে) : ইরাক ০
ফিলাডেলফিয়ায় ফ্রান্সের সামনে ছিল দুই প্রতিপক্ষ। ইরাক এবং বজ্রগর্ভ বৃষ্টি। কেউই হারাতে পারল না ‘লে ব্লুজ’দের। ফ্রান্সের শক্তিশেলে বিদ্ধ হল ইরাক। এদিন যেন ‘অপারেশন শামাল’ অভিযানে নেমেছিল ফ্রান্স। এবার ‘মিত্র’ নয়, প্রতিপক্ষ ছিল ইরাক। দিদিয়ের দেশঁর তারকাখচিত দলের সামনে ছিল সহজ সমীকরণ। ইরাককে হারাও আর পরের পর্ব নিশ্চিত করো। সেই লক্ষ্যে শুরু থেকেই আগ্রাসী খেলল দু’বারের বিশ্বজয়ীরা। এমবাপে-ওলিসেদের ব্যালিস্টিক মিসাইলে ছিন্নভিন্ন হল ইরাক। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ৩-০ গোলে ইরাককে হারিয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করল ফ্রান্স।
অথচ মহাশক্তিধর ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নামার আগে ফুটবলারদের মধ্যে ইতিবাচক দর্শন ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন ইরাক কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড। জানিয়েছিলেন, তিনি সব সময় জেতার চিন্তা করে মাঠে নামা কোচ। পরাজয় ঠেকানো তাঁর লক্ষ্য নয়। কিন্তু ম্যাচের স্কোর লাইন দেখে প্রশ্ন উঠবেই উঠবে, কতটা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন জিদান ইকবাল, আয়মান হুসেনরা? ম্যাচের শুরুতেই আক্রমণে যায় ফ্রান্স। প্রথম মিনিটে মানু কোনের বাঁ পায়ের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট। মিনিট গড়াতে না গড়াতেই ইরাকও অবশ্য দ্রুত জবাব দেয়। লেফট ব্যাক মার্চাস ডস্কি ফ্রান্সের অর্ধে এগিয়ে যান। কোনের ট্যাকেল তাঁকে না আটকালে বিপদ হতেই পারত। এতে ফ্রিকিক পেলেও গোল পায়নি ইরাক। ৭ মিনিটে মাইকেল ওলিসের শট প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা ব্লক করে দেন। পরমুহূর্তেই সুযোগ নষ্ট এমবাপের। তবে চাপ ধরে রেখে ১৪ মিনিটে এগিয়ে যায় ফ্রান্স। ডান দিক থেকে মাইকেল ওলিসের সঙ্গে ওয়ান-টু পাস খেলে বল পান তিনি। এরপর বক্সের বাইরে থেকে জোরাল শটে বল জালে জড়ান। ইরাকের গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না।
পিছিয়ে পড়লেও পালটা আক্রমণে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালিয়ে যায় ইরাকও। ২৭ মিনিটে সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল তারা। ছয় গজের বক্সের ডান দিক থেকে ডস্কির ক্রস থেকে আলি আল হামাদির হেড লক্ষ্যভ্রষ্ট। এই সময়টায় বল দখলের লড়াইয়ে ফ্রান্স এগিয়ে থাকলেও ইরাকের রক্ষণ ভাঙতে পারেনি তারা। প্রথমার্ধে আর কোনও গোল হয়নি। দুই দলের মধ্যে ফারাক গড়ে দেন এমবাপে। প্রথমার্ধে ফ্রান্সের খেলায় তেমন দাপট ছিল না। গোল লক্ষ্য করে তারা ৭টি শট নেয় ফ্রান্স। কিন্তু লক্ষ্যে থাকে মাত্র একটি শট। অন্যদিকে, আয়মান হুসেনের চোট ইরাকের পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দেয়।
আগে থেকেই ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাতের পূর্বাভাস ছিল। প্রথমার্ধে খেলার মাঝেই শুরু হয় ভারী ব্যাপক বৃষ্টি। তার মধ্যেই খেলা চলতে থাকে। তবে প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার পর আবহাওয়া আরও খারাপ হয়ে যাওয়ায় ম্যাচ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয় খেলা। এই বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী, স্টেডিয়ামের ৮ মাইলের মধ্যে বজ্রপাত হলে অন্তত ৩০ মিনিট খেলা বন্ধ রাখতে হবে। দর্শকদেরও চলে যেতে হবে নিরাপদ স্থানে। স্টেডিয়ামের স্ক্রিনেও ভেসে ওঠে সেই বার্তা। সেইমতো স্পেশাল কনকোর্স এলাকায় জড়ো হতে দেখা যায় দর্শকদের। গ্যালারিও ফাঁকা হয়ে যায়। গত বছর ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের কয়েকটি ম্যাচও খারাপ আবহাওয়ার কারণে দীর্ঘক্ষণ বন্ধ ছিল। এর মধ্যে চেলসি বনাম বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের ম্যাচ শেষ হতে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা সময় লেগেছিল। এবারের বিশ্বকাপে এর আগে কোনও ম্যাচ আবহাওয়ার কারণে বন্ধ না হলেও, ইংল্যান্ড ও কোস্টারিকার প্রস্তুতি ম্যাচ বজ্রপাতের কারণে এক ঘণ্টা দেরিতে শুরু হয়। এবার বিশ্বকাপের মূলপর্বেও আবহাওয়ার চোখ রাঙানি এড়ানো গেল না। বৈরী আবহাওয়ার কারণে দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হল ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট পর। বৃষ্টি কমায় দর্শকরাও গ্যালারিতে ফেরেন।
বৃষ্টির পর ফ্রান্স যেন আরও ক্ষুধার্ত হয়ে ওঠে। ৫৪ মিনিটে পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো গোল ‘উপহার’ পেলেন এমবাপে। ইরাক ডিফেন্ডার তাহসিন লম্বা গোল কিকের পরিবর্তে পাস বাড়ান গোলকিপার ফাহদিলকে। যা কিছুটা দূরে থাকায় ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। বল সোজা চলে যায় দেম্বেলের কাছে। দ্রুত পাস বাড়ান ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা এমবাপেকে। সহজেই গোল করেন ২৭ বছরের তারকা। ৬৬ মিনিটে মাইকেল ওলিসের ঠিকানালেখা থ্রু থেকে তৃতীয় গোল দেম্বেলের। শেষ পর্যন্ত খেলার ফলাফল থাকে ৩-০। দেশের হয়ে শততম ম্যাচে এমবাপে জোড়া গোল করে গার্ড মুলার (১৪ গোল) এবং রোনাল্ডো নাজিরিওর (১৫ গোল) নজির ভেঙে স্পর্শ করলেন মিরাস্লোভ ক্লোজের বিশ্বকাপে করা ১৬ গোলের রেকর্ড। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। তাঁর সামনে এখন কেবল লিওনেল মেসি (১৮)। টানা দ্বিতীয় জয়ের পর ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘আই’ থেকে প্রথম দল হিসাবে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিল দিদিয়ের দেশঁর দল। সবমিলিয়ে চার ঘণ্টার ম্যারাথন ফুটবলে দর্শকদের রাঙালেন এমবাপে। দেশের হয়ে এখন তাঁর গোলসংখ্যা ৬০।