কলকাতা, 23 জুন: স্বাস্থ্য পরিষেবাকে রাজ্যের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে এ বার বাজেটে একের পর এক বড় ঘোষণা করল সরকার । গত অর্থবর্ষের তুলনায় প্রায় 1800 কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ করে স্বাস্থ্য খাতে কার্যত 'মাস্টারপ্ল্যান' প্রকাশ করল টিম শুভেন্দুর সরকার ৷ সুন্দরবনের প্রত্যন্ত দ্বীপাঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের পাহাড়, চিকিৎসা শিক্ষা থেকে মেডিক্যাল ট্যুরিজম- স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে ।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সুন্দরবন । দীর্ঘদিন ধরেই দুর্গম দ্বীপাঞ্চলে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ । সেই সমস্যার সমাধানে ভাসমান ও মোবাইল মেডিক্যাল ইউনিট চালু করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় । পাশাপাশি জরুরি রোগী পরিবহণের জন্য থাকবে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি-সমৃদ্ধ হাই-স্পিড মোটরবোট অ্যাম্বুল্যান্স । বিশেষ নজর দেওয়া হবে প্রসূতি মা, নবজাতক শিশু, টিকাকরণ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর ।
স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে । আয়ুষ্মান ভারত-প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার আওতায় দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারগুলিকে বছরে 5 লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা দেওয়া হবে । এর সঙ্গে যুক্ত করা হবে 70 বছরের ঊর্ধ্বে সমস্ত নাগরিক, আশা কর্মী, আইসিডিএস কর্মী এবং গিগ ওয়ার্কারদের । যাঁরা এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারবেন না, তাঁদের জন্য মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকবে ।
সাশ্রয়ী চিকিৎসার লক্ষ্যেও একাধিক ঘোষণা করা হয়েছে । প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় জনঔষধি প্রকল্পের মাধ্যমে 50 থেকে 80 শতাংশ কম দামে জেনেরিক ওষুধ পাওয়া যাবে । পাশাপাশি 'অমৃত' প্রকল্পের আওতায় জীবনদায়ী ওষুধ, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম এবং ইমপ্ল্যান্ট 50 থেকে 90 শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ে সরবরাহ করা হবে । জেলা ও মহকুমা হাসপাতালগুলিতে গড়ে তোলা হবে বিশেষ স্টোর ।
চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও নজরকাড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার । আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং পশ্চিম বর্ধমানে চারটি নতুন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ তৈরি হবে । বীরভূমের সিউড়ি সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতালকে উন্নীত করা হবে মেডিক্যাল কলেজে । এর ফলে রাজ্যে 650টি নতুন এমবিবিএস আসন এবং 450টি পিজি আসন বৃদ্ধি পাবে ।
এছাড়াও মেডিক্যাল ট্যুরিজমকে উৎসাহ দিতে পাঁচটি আঞ্চলিক মেডিক্যাল হাব গড়ে তোলা হবে পিপিপি মডেলে । বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি নতুন সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতালগুলিতে 50 শতাংশ শয্যা সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে সংরক্ষণের শর্তও বেঁধে দিয়েছে সরকার ।
একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলিতে রোগীদের খাদ্য বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে । রোগীপিছু দৈনিক খাদ্য খরচ 56.64 টাকা থেকে বাড়িয়ে 110 টাকা করা হয়েছে । আশা ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের মাসিক সম্মানী 5000 টাকা বৃদ্ধি, ভেক্টর কন্ট্রোল কর্মীদের অতিরিক্ত ভাতা এবং চা-বাগান শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরিষেবা উন্নয়নের ঘোষণাও বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ।
সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতে এ বছরের বাজেট শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধির হিসাব নয়, বরং আগামী কয়েক বছরের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নির্মাণের রূপরেখা বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল ।