• মেয়ের খোঁজে বিধাননগরে ছুটে এলেন সিউড়ির বৃদ্ধ, লাল কুর্তি পরা তরুণীকে দেখে এগিয়ে গেলেন, তার পর...
    এই সময় | ২৩ জুন ২০২৬
  • সারা দিন ধরে রাস্তায় রাস্তায় মেয়েকে খোঁজাখুঁজির পরে সবে ঘরে ঢুকেছিলেন বাবা। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। গোটা শরীর যেন অসাড়! গত তিন মাস ধরে এ ভাবে দিগভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরির পরে এখন শুধুই বুকভাঙা শূন্যতা গ্রাস করে বৃদ্ধকে। সঙ্গে মেয়ের মুখখানা দেখতে না পাওয়ার একটা চাপা অস্থিরতা! এমন অবস্থাতেই সোমবার রাতে আচমকা ফোনটা এসেছিল। কোনও ক্রমে ফোনটা তুলে কানে দিতেই যা শুনেছিলেন বৃদ্ধ, তাতে আর চাপা থাকেনি সেই অস্থিরতা। মুহূর্তের মধ্যে তা যেন বহু গুণে বেড়ে গিয়েছে।

    ফোনের ও পার থেকে এক কণ্ঠস্বর বৃদ্ধকে জানিয়েছিলেন, তাঁর মেয়ের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। এ কথা শোনা মাত্রই কিছু ক্ষণের জন্য স্থবির হয়ে গিয়েছিলেন বৃদ্ধ! কী ভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করবেন, বুঝতে না পেরে তাঁর কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। পরক্ষণে সম্বিত ফেরে। কোনও ক্রমে নিজেকে সামলে ধরা গলায় বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমার মেয়ে... কোথায়, কোথায় ও?’ জবাবে ফোনের ওপারের কণ্ঠস্বর তাঁকে জানায়, তাঁর মেয়েকে কলকাতার সল্টলেকে পাওয়া গিয়েছে। পরে সেই মেয়েটির একটি ভিডিয়োও পাঠানো হয় বৃদ্ধকে। যা দেখে অবিকল নিজের মেয়ে বলেই মনে হয়েছিল বীরভূমের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো সেই বাবা অর্ধেন্দু সিংয়ের। সেই একই চোখ, মুখখানাও তো একই।

    আর দেরি করেননি বৃদ্ধ। রাতেই রামপুরহাট থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেন। পুলিশের থেকে জানতে পেরেছিলেন, মেয়েকে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেই মতো সেখানেই পৌঁছে গিয়েছিলেন অর্ধেন্দু। থানায় ঢোকার মুহূর্তে এতটাই অস্থির লাগছিল যে, আর নিজেকে সামলাতে পারেননি বৃদ্ধ। দৌড়ে থানার ভিতরে ঢুকে মেয়েকে খোঁজা শুরু করেছিলেন। পরে যখন উদ্ধার হওয়া মেয়েটিকে তাঁর সামনে আনা হলো, প্রথম দেখায় তখনও নিজের মেয়েই ভেবেছিলেন বৃদ্ধ। মেয়েটির পরে লাল কুর্তা। মাথার চুল উশকোখুশকো। কিন্তু এ কি সত্যিই তাঁর মেয়ে অমৃৃতা সিং?

    চোখে-মুখে অনেকটা মিল রয়েছে ঠিকই, কিন্তু আচার-আচরণ তো মেয়ের মতো নয়। তা ছাড়া মেয়ের নাকে-কানেও তো কোনও ছিদ্র ছিল না! কিন্তু উদ্ধার হওয়া তরুণীর তা ছিল। বুঝতে আর অসুবিধা হয়নি—সেই ভবঘুরে তরুণী তাঁর মেয়ে নয়।সেই মুহূর্তে আবার ফিরে এসেছিল সেই ক্লান্তি, শরীরে সেই বিধ্বস্ত-ভাব। চোখে-মুখে আবার সেই শূন্যতা। অসাড় হাতে কোনও রকমে থানায় মুচলেকা দিয়ে থানা থেকে বেরিয়ে যান অর্ধেন্দু।

    চোখে জল। আবার তাঁর গলা ধরে এসেছে। সেই অবস্থায় সিউড়ি ফিরে যাওয়ার সময়ে বৃদ্ধ ‘এই সময় অনলাইন’-কে বলেন, ‘ভিডিয়ো দেখে মনে হয়েছিল, আমারই মেয়ে। কিন্তু এসে দেখলাম, ও আমার মেয়ে নয়। অমৃতার তো নাকে-কানে ফুটো ছিল না। জন্মদাগও মেলেনি। অনেক আশা নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু আমার মেয়েকে এখনও পাওয়া যায়নি। ’

    মেয়ের খোঁজে গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে রাস্তায় রাস্তায় অর্ধেন্দুর ঘুরে বেড়ানোর ছবি কয়েক দিন ধরেই ভাইরাল সমাজমাধ্যমে। নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বছর চব্বিশের সেই তরুণী অমৃতার ছবির সঙ্গে সল্টলেকের এক ভবঘুরের মিল পেয়েছিলেন অটোচালক সমীর সর্দার। রাত ১১টা নাগাদ সল্টলেকের ১৩ নম্বর ট্যাঙ্কের কাছে ফুটপাতে শুয়ে থাকা সেই তরুণীকে দেখে সন্দেহ হয়েছিল তাঁর। পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আশপাশের কয়েক জনকে ডেকে এনেও মেয়েটিকে দেখান সমীর। তাঁদের সকলেরই মেয়েটিকে অমৃতা বলেই মনে হয়েছিল। এর পর আর দেরি না করে সমীর সোজা অর্ধেন্দুকে ফোন করেছিলেন। ভাইরাল হওয়া পোস্ট থেকেই ফোন নম্বর পেয়েছিলেন তিনি। এর পরে পুলিশেও খবর দেন স্থানীয়েরা।

    প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিধাননগর দক্ষিণ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছতেই সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন সেই ভবঘুরে তরুণী। যদিও পরে রাত দেড়টা নাগাদ তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়। নিয়ে যাওয়া হয় থানায়। পুলিশ সূত্রে খবর, এর পরেই অর্ধেন্দুকে ফোন করে গোটা বিষয়টি জানানো হয়। বিধাননগর দক্ষিণ থানাতেই পৌঁছতে বলা হয়েছিল তাঁকে।

    তবে এখনই আশা ছাড়ছেন না অর্ধেন্দু। তিনি জানিয়েছে, এত দিন ধরে তিনি যে ভাবে মেয়েকে খুঁজছেন, সে ভাবেই খুঁজবেন। বৃদ্ধ বলেন, ‘আমি মেয়ের খোঁজ চালিয়েই যাব। আমার বার্তা যে ভাবে বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছেঁ দেওয়া হয়েছে, তাতে আমি কৃতজ্ঞ।’

  • Link to this news (এই সময়)