একদিকে পার্থ-অর্পিতা। অন্য দিকে সব্যসাচী-টিনা। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের ফ্ল্যাট থেকে নগদ ৫০ কোটি টাকা উদ্ধার করেছিল ইডি। সঙ্গে সোনাদানাও মিলেছিল প্রচুর। সোমবার রাতে নদিয়ার তেহট্ট থেকে তোলাবাজির অভিযোগে ধৃত সব্যসাচী দত্ত ঘনিষ্ঠ টিনা ভৌমিক সাহা-র বাড়ি থেকে ৩ কেজি ৩৭২ গ্রাম সোনা উদ্ধার করল বিধাননগর দক্ষিণ থানার পুলিশ। সঙ্গে উদ্ধার হয়েছে কয়েক লক্ষ নগদও। কিন্তু কে এই টিনা?
টিনা তৃণমূল নেত্রী। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই দলের সঙ্গে যুক্ত। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি শিক্ষিকা। নাজিরপুর বাগাডোবা স্কুলে পড়ান তিনি। তবে এই চাকরি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০১১-এর পরে, মানে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরেই চাকরি পান তিনি। সেটা নাকি ‘সাদা খাতা’ জমা দিয়ে, এমনই অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। ২০১৮ সালে প্রথমবার ভোটে দাঁড়ান। তখন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ্যে আসে। নদিয়া জেলা পরিষদের সদস্যও হন। তৃণমূলের সামাজিক-সাংস্কৃতিক মহিলা শাখা ‘বঙ্গ জননী’-র নদিয়া জেলার সভাপতি হিসেবেও একবাক্যে তাঁকে লোকে চেনে।
গোটা এলাকায় তাঁর দাপটে বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খায়। টিনার বাড়ি থেকে ৩ কেজি সোনা উদ্ধারের ঘটনায় চমকে গিয়েছেন অনেকেই। তবে চমকের বাকিও আছে অনেক। এ বার জানা গেল, নিয়োগ দুর্নীতি মামলাতেও তাঁর নাম জড়িয়েছিল। বেআইনি সম্পত্তি কেনাবেচার অভিযোগও উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তৃণমূলের অন্দরে তাঁকে নিয়ে ক্ষোভের ধিকিধিকি আগুন জ্বলছিল দীর্ঘদিন ধরেই।
নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ধৃত তথা প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন সভাপতি মানিক ভট্টাচার্যের সঙ্গে টিনার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে এক সময়ে সরব হয়েছিলেন তেহট্টের প্রাক্তন বিধায়ক তাপসকুমার সাহা। নাজিরপুর এলাকার একটি বিএড কলেজের মালিকানাও নিজের নামে করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। প্রাথমিক শিক্ষক পদে চাকরি পাইয়ে দেওয়া আর নিজেদের পছন্দের এলাকায় বদলি করার নেপথ্যে মূল পাণ্ডা ছিলেন টিনাই। কোটি কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
টিনার বিপুল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তিও নজরে রয়েছে তদন্তকারীদের। এমনকী নদিয়া ও মুর্শিদাবাদের একাধিক ইটভাটা জোর করে দখল করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে ফ্ল্যাটের প্রতি তাঁর ‘মোহ’ নাকি একটু বেশি। নিউটাউনের সাপুরজি আবাসন, কৃষ্ণনগরের সেন্ট্রাল মলের অভিজাত এলাকা, বাগুইআটি এবং বিরাটিতে টিনা ভৌমিক সাহার একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের হদিশ পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
গত লোকসভা ভোটের সময়ে রানাঘাট সাংগঠনিক জেলার সভাপতি করা হয় সব্যসাচীকে। তখনই তৃণমূল নেতার সঙ্গে আলাপ হয় টিনা। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। আর সেটাকে কাজে লাগিয়েই একের পর এক দুর্নীতিতে তিনি হাত পাকিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। সোমবার রাতে সব্যসাচীকে সঙ্গে নিয়েই টিনার বাড়িতে হানা দিয়েছিল বিধাননগর দক্ষিণ থানার পুলিশ। তাঁর শ্বশুরবাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়। দুই জায়গা মিলিয়ে ৩ কেজির উপরে সোনা আর লক্ষাধিক নগদ টাকা উদ্ধার হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। টিনা বর্তমানে পলাতক। তাঁর খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা জানতে নিয়ে টিনার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেছিল এই সময় অনলাইন। তবে তিনি ফোন ধরেননি। উত্তর দেননি মেসেজেরও।