আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রাক্তন বাম নেতা ঋতব্রত ব্যানার্জি এখন খণ্ডিত তৃণমূলের বৃহত্তম অংশের দাবিদার। তিনিই আপাতত নব-নির্বাচিত বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। তবে বাজেট অধিবেশনের প্রথম বক্তব্যে বিরোধী দলনেতার বক্তব্যে উঠে এল বিভিন্ন স্তরের বাম আদর্শের কথা, উঠে এল বাম চিন্তক থেকে শুরু করে বিভিন্ন বামমনস্ক মানুষের কথা। কোথাও গিয়ে কি আদি রাজনীতির চিন্তার জগত থেকে এখনও বার হয়ে আসতে পারেননি ঋতব্রত? নাকি তৃণমূলের ধরণই এমন, যেখানে রাজনীতির আদর্শের কড়াকড়ি নেই, আছে ইস্যুভিত্তিক সম্মেলন। সেই কারণেই ঋতব্রতরা এত সহজে জাতীয়তাবাদী দলে থেকেও বামপন্থার চর্চা করে গেলেন। আর সেই চর্চার ধরণ দেখা গেল এদিনের বিধানসভা অধিবেশনে।
মঙ্গলে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার আলোচনায় বিভিন্ন মূলগত প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হল। সরকার পক্ষ বা বিরোধী পক্ষের প্রায় প্রতি বক্তা, কুণাল ঘোষ-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রশ্নে তর্ক করলেন। হট্টগোল করে অধিবেশ ভণ্ডুল করে দেওয়ার মানসিকতা কারওর মধ্যেই দেখা যায়নি। তবে ঋতব্রত বিধানসভায় যে প্রশ্ন তুললেন, সেখানেও রয়ে গেল বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। ঋতব্রত প্রথমেই দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন হকার উচ্ছেদ নিয়ে। সেখানে তিনি সাধারণ প্রান্তিক মানুষের অধিকারের প্রশ্ন তোলেন। তারপর আসেন ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গে। এখানেই তিনি টেনে আনেন মার্কস-এঙ্গেলসের আলোচনার প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, পৃথিবীর দুজন শ্রেষ্ঠ মণীষী বলেছিলেন ছাত্র রাজনীতি হল, ‘ব্যাটল অফ আইডিয়াজ।’ কেন রাজনীতির ময়দানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বা ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম, সেকথা তিনি এই দুই নির্দিষ্ট ভাবধারার মানুষকে নিয়ে আলোচনা করে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। ‘মিনস অফ প্রোডাকশন’ বা ‘ক্লাস’ শব্দগুলোরে মধ্যে দিয়ে কোথাও যেন ঠিকরে আসে বামপন্থার প্রশিক্ষণের আলো। এতবছর তৃণমূলে থেকেও তাঁর মধ্যে বামপন্থার বীজ এখনও কতটা শক্তিশালী, সেটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
এরপরে তিনি তুলে আনেন জওহরলাল নেহরুর ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’-এর কথা। আর সেই সময়েই হঠাৎ খেপে ওঠেন শাসকদলের বিধায়ক ও মন্ত্রীরা। সোহরাওয়ার্দির নামে থাকা রাস্তা গোপাল মুখোপাধ্যায়ের নামে করার বিষয়ে আলোচনা তুলতেই বিজেপি বিধায়করা খেপে ওঠেন ও প্রতিবাদ করেন। তখনই ঋতব্রত স্মরণ করিয়ে দেন শুভেন্দু অধিকারীর কথাই। মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘হাউজ বিলঙস টু দ্যা অপজিশন’। তখনই কবীর সুমনের গানের লাইনে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন ঋতব্রত। তিনি বলেন, ‘বিরোধীকে বলতে দাও, তোমার কাজের ফর্দ দিক।’ শেষে ঋতব্রতর বক্তব্যে উঠে আসেন কিউবার বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোও। ‘La Historia me absolverá’-এর উল্লেখ করেন ঋতব্রত। উল্লেখ্য ১৯৫৩ সালের ১৬ অক্টোবর আদালতের সামনে ঐতিহাসিক ডিফেন্স বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সময়ে চারঘণ্টা ভাষণ দিয়েছিলেন বিপ্লবী ফিদেল। সেই ভাষণ ঐতিহাসিক হয়ে আছে। সেই ভাষণ যে নামে বই আকারে প্রকাশ পেয়েছে, সেই বইটির নাম "La historia me absolverá" যার বাংলা অনুবাদও প্রকাশিত হযেছে। সেই কথাও উঠে এসেছে ঋতব্রতর কথায়।
তাহলে মোদ্দা কথা কী দাঁড়াল, এখনও, এতদিন তৃণমূলের কথা বলার পরেও জীবনের প্রথম বিধানসভার ভাষণ ও বিরোধী দলনেতা হিসাবে ভাষণে ঋতব্রত আশ্রয় নিলেন সেই বামপন্থী চিন্তাবিদ ও বাম বিশ্বনেতাদের। এসব দেখে-শুনে হয়ত মুচকি হাসছেন এই বাংলার বাম নেতৃত্ব। কারণ, ঋতব্রতরা যে ন্যারেটিভ তৈরি করার চেষ্টা করছেন, তাতে আদতে শক্তিশালী হবে চিন্তার ক্ষেত্র। যদিও, একই সঙ্গে একটি বৃত্তে অরূপ বিশ্বাস, সন্দীপন সাহা ও ঋতব্রত ব্যানার্জি কী করে রাজনীতি করবেন, সেটাই এখন দেখার। যদিও ভারতীয় রাজনীতিতে সবই সম্ভব।