• নবান্নে এডিবি-র কর্তাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী, উন্নয়ন নিয়ে পরিকল্পনা
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ২৪ জুন ২০২৬
  • রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকার ২২ জুন সোমবার তার পূর্ণাঙ্গ বাজেট বিধানসভায় পেশ করেছে। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত তাঁর প্রথম বাজেট রাজ্যে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও পরিকাঠামো উন্নয়নের এক নীল নকশা তুলে ধরেছেন। বাজেট পেশের একদিন পরই নবান্নে আসলেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্ক বা এডিবির শীর্ষ কর্তারা। মঙ্গলবারই নবান্নে এডিবির পদস্থ কর্তারা রাজ্যের মুখ্য সচিব মনোজ আগরওয়াল এবং মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্তর সঙ্গে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করলেন। সূত্রের খবর, বাংলায় শিল্প সহায়ক পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড়সড় আর্থিক সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়েই নবান্নে এসেছিলেন এডিবির কর্তারা। নীতি আয়োগের নীতি মেনে রাজ্যে একাধিক ‘সিটি ইকোনমিক রিজিয়ন’ গড়ে তোলা নিয়ে এদিন বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে খবর।

    উল্লেখ্য, কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার দেশের ৪টি শহরকে কেন্দ্র করে সিটি ইকোনমিক রিজিয়ন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। ওই চার শহরের মধ্যে আছে সুরাত, বেনারস, ভুবনেশ্বর ও বিশাখাপত্তনম। এই প্রকল্পে ওই চার শহরের ভোল বদলে গিয়েছে। এবার একই রকমভাবে বাংলাতেও নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে এডিবি। সেই সঙ্গে রয়েছে ৬ দফা মাস্টারপ্ল্যান। এডিবি শুধু সিটি ইকোনমিক রিজিয়নের প্রস্তাবই দেয়নি, শিল্প করিডোর গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও আর্থিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও আগ্রহ দেখিয়েছে।

    সূত্রের খবর, এডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, পুরসভার সীমানার বাইরে পার্শ্ববর্তী জেলায় শিল্পাঞ্চল, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এবং শ্রমবাজারকে একত্রিত করে বৃহত্তর অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এজন্য সম্ভাব্য চারটি অঞ্চলকেও চিহ্নিত করা হয়েছে। গুজরাতের সুরাতের আদলে কলকাতা-হাওড়া-হুগলি-উলুবেড়িয়া-ডানকুনি বেল্টকে যুক্ত করে ইঞ্জিনিয়ারিং, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিক্স ও লজিস্টিকস ক্লাস্টার নিয়ে তৈরি হবে কলকাতা মেট্রোপলিটন সিইআর।

    ভুবনেশ্বরের মডেলকে অনুসরণ করে জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারকে নিয়ে আইটি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা,পর্যটন হাব ও অ্যাগ্রোপ্রসেসিং ক্লাস্টার তৈরি হবে। যার নাম দেওয়া হয়েছে শিলিগুড়ি সিইআর। তৃতীয় সিটি ইকোনমিক রিজিয়নটি গড়ে উঠবে হলদিয়া ও দিঘাকে কেন্দ্র করে। এখানে বিশাখাপত্তনমের মতো বন্দর-ভিত্তিক শিল্পাঞ্চল তৈরি হবে। যেখানে একসঙ্গে মিলবে কেমিক্যাল, রিফাইনারি শিল্প ও পর্যটন। ভারী শিল্প, ইস্পাত, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ক্লিন ম্যানুফ্যাকচারিং হাব নিয়ে তৈরি হবে দুর্গাপুর-আসানসোল সিটি ইকোনমিক রিজিয়ন। সূত্রের খবর, রাজ্যে কয়েকটি শিল্প করিডর তৈরিতেও এডিবি আর্থিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল কলকাতা-ডানকুনি-দুর্গাপুর-আসানসোল ম্যানুফ্যাকচারিং করিডোর। হলদিয়া-খড়্গপুর শিল্প করিডোর এবং শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি এগ্রো-প্রসেসিং করিডোর।

    জানা গিয়েছে, দেশ-বিদেশের বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে তিনটি বড় কেন্দ্র চিহ্নিত করার প্রস্তাবও দিয়েছেন এডিবির কর্তারা। তাঁদের প্রস্তাবে হুগলি জেলার ডানকুনিকে পূর্ব ভারতের বৃহত্তম মাল্টিমোডাল লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি শিলিগুড়িকে উত্তর-পূর্ব ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলির গেটওয়ে হিসেবে এবং হলদিয়াকে সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

    বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধের বিষয়টিতেও গুরুত্ব দিয়েছেন এডিবির শীর্ষ কর্তারা। এজন্য কলকাতার বায়ুদূষণ মোকাবিলায় শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় কিছু কৌশলগত পরিবর্তনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে আছে ইলেকট্রিক বাসের ব্যবহার বাড়ানো, গণপরিবহণ ও শেয়ার্ড ট্রান্সপোর্টের সম্প্রসারণ এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ। মূলত দূষণহীন, গতিসম্পন্ন ও আধুনিক গণপরিবহন চালুর প্রস্তাব দিয়েছে এডিবি। দূষণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নীতি আয়োগের তরফেও একই পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

    শিল্পায়নের লক্ষ্যে শিল্প তালুকগুলির কাছাকাছি এলাকায় পরিযায়ী শ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষের থাকার জন্য স্বল্পমূল্যের ভাড়ার আবাসন তৈরির সুপারিশ করেছে এডিবি। তবে সস্তার আবাসন হলেও সেখানে হাসপাতাল থেকে শুরু করে স্কুল, হস্টেল, খেলার মাঠ ও যাতায়াতের সব রকম মৌলিক পরিকাঠামো একই সঙ্গে থাকবে। অন্যদিকে পর্যটনের ক্ষেত্রে বারাণসী মডেলের কথা তুলে ধরে পরিকাঠামো ও হেরিটেজের মেলবন্ধনে ৪টি ক্লাস্টার তৈরি প্রস্তাব নিয়েও এডিবির কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে খবর। যার মধ্যে আছে দার্জিলিং-ডুয়ার্স-কালিম্পং-তিস্তা সার্কিট। উপকূলীয় এলাকায় দিঘা-মন্দারমণি-তাজপুর, কলকাতা-মুর্শিদাবাদ-বিষ্ণুপুর হেরিটেজ ক্লাস্টার এবং ইকো-ট্যুরিজম ক্লাস্টার সুন্দরবন। এছাড়াও শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারের মতো যে সব শহরে দ্রুত নগরায়ন হচ্ছে সেখানে ভূগর্ভস্থ জলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তিস্তা ও অন্যান্য নদীর জলকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিশোধন করে ২৪ ঘণ্টার আধুনিক জল সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা নিয়েও এডিবির কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে খবর। সূত্রের খবর, আগামিদিনে এই কাজে এডিবির আর্থিক সহায়তাও মিলতে পারে।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)