গভীর রাত। পাহাড়ে লাগাতার ভারী বৃষ্টির জেরে ফুঁসছে তিস্তা। নদীর গর্জনের মাঝেই হঠাৎ তিস্তা খোলা এলাকায়, ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের (NH-10) ধারে নজরে এল এক অদ্ভুত দৃশ্য। অজগরের মতো বিশাল এক সাপ, কিন্তু গায়ের রং দুধের মতো ধবধবে সাদা! ঘুটঘুটে অন্ধকারে এমন শ্বেতশুভ্র সাপ দেখে রীতিমতো শিউরে উঠেছিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
এমন অদ্ভুত দর্শন সাপ আগে কখনও দেখেননি স্থানীয় বাসিন্দারা। রাতারাতি এই রহস্যময় সাপের ছবি ও ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে আর উত্তরবঙ্গ জুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল চর্চা। ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, এটি একটি অত্যন্ত বিরল ‘অ্যালবিনো পাইথন’ বা সাদা অজগর। এমন প্রাণীর দর্শন মেলা বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের কাছেও এক অভাবনীয় ঘটনা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার রাত প্রায় আড়াইটের সময়ে শিলিগুড়ি-সিকিম জাতীয় সড়কের পাশে তিস্তা খোলা এলাকায় কর্মরত কয়েকজন শ্রমিক প্রথম সাপটিকে দেখতে পান। নদীর ধারে পাথরের উপর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলছিল সাপটি। পরে স্থানীয় বাসিন্দা রাধাকৃষ্ণন পানিক্কর ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁর ফোনে সাপটির ছবি ও ভিডিয়ো তুলেছিলেন। সেই ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করতেই মুহূর্তের মধ্যে তা ভাইরাল হয়ে গিয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে সিকিম ও দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে অবিরাম বৃষ্টির জেরে তিস্তা নদীতে জলস্তর বিপজ্জনক ভাবে বেড়ে গিয়েছে। নদীর প্রবল স্রোতে বিভিন্ন এলাকায় পাড় ভাঙছে ও ধস নামছে। দুধিয়া সেতু সংলগ্ন ডাইভার্সন রাস্তার একাংশও জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেকের অনুমান, উজানের কোনও বনাঞ্চল বা পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সাপটি তিস্তার প্রবল স্রোতে ভেসে এসে নদীর তীরে আশ্রয় নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালবিনিজম (Albinism) একটি জিনগত বৈশিষ্ট্য। এর ফলে যে কোনও প্রাণীর শরীরে মেলানিনের ঘাটতি দেখা যায়। এর ফলেই প্রাণীর গায়ের স্বাভাবিক রং হারিয়ে গিয়ে তা সম্পূর্ণ সাদা হয়ে ওঠে। সাপের ক্ষেত্রেও এই ঘটনা ঘটে। জঙ্গলের প্রতিকূল পরিবেশে এমন প্রাণীর বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন। সাদা রং হওয়ায় সহজেই শিকারীদের নজরে পড়ে যায়। তাই প্রকৃতির কোলে এদের দেখা পাওয়া খুবই বিরল ঘটনা।
এ বিষয়ে রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ ওরাওঁ বলেন, ‘উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে এখনও বহু বিরল ও অজানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে। যে সাপটির দেখা মিলেছে সেটা বিরল থেকে বিরলতম। এটা আমাদের জন্য সুখবর। বনদপ্তর সব ধরনের প্রাণী ও তাদের আবাসস্থল রক্ষায় প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে।’
তিনি আরও জানান, এই ধরনের বিরল প্রাণীর দেখা পাওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে প্রাণীটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা আরও বেশি জরুরি। বনদপ্তর বিষয়টির উপর কড়া নজর রাখছে।
অন্যদিকে, সর্পবিশারদ মিন্টু চৌধুরী বলেন, ‘ভিডিয়োতে দেখা প্রাণীটি যে অ্যালবিনো অজগর, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই ধরনের সাপ সাধারণত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে দেখা যায়। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মায়ানমার এলাকায় এই সাপের দেখা মেলে। পশ্চিমবঙ্গে এমন ঘটনার নজির কার্যত নেই বললেই চলে। তাই সাপটির সুরক্ষা ও সংরক্ষণের বিষয়ে এখনই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’