লালবাগ: বাজেটে মুর্শিদাবাদের লালবাগে ভাগীরথীর উপরে সেতু নির্মাণের জন্য ১২০০ কোটি টাকা ধার্য করেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। ওই ঘোষণার মধ্যে দিয়ে প্রায় তিন দশকের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে লালবাগবাসীর। মুর্শিদাবাদ-জিয়াগঞ্জ ব্লকের আমানিগঞ্জ ঘাট থেকে খোশবাগ পর্যন্ত ভাগীরথীর উপরে সেতু নির্মাণের কথা প্রথম শোনা গিয়েছিল ১৯৯৬-এ।
সিটি মুর্শিদাবাদ ব্যবসায়ী সমিতির তরফে ভাগীরথীর উপরে তৃতীয় সেতু নির্মাণের প্রথম দাবি তোলা হয়। ওই ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক তথা মুর্শিদাবাদ জেলা চেম্বার অফ কমার্সের সাধারণ সম্পাদক স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, 'ভাগীরথীর উপরে সেতু তৈরি হলে উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ছাড়াও বিহার, ঝাড়খণ্ডের সঙ্গে লালবাগের যোগাযোগ সহজ হবে। ওই একই দাবিতে গত ২০০৭ সালে আন্দোলন শুরু করে মুর্শিদাবাদ নগর উন্নয়ন কমিটি।
কমিটির কর্ণধার আবদুর রহমান খান ওরফে এআর খান রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সেতু নির্মাণের আবেদন জানানোর পাশাপাশি বিষয়টি তৎকালীন রাষ্ট্রপতিকেও চিঠি লিখে জানান। রাষ্ট্রপতি দপ্তর থেকে চিঠি পেয়ে নড়েচড়ে বসে পঞ্চায়েত দপ্তরও। তৎকালীন বামফ্রন্ট পরিচালিত মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদ সমীক্ষার কাজও শুরু করে।
কিন্তু তার পরে ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি! এর মাঝে মারা গিয়েছেন এআর খান। সেতু তৈরি না হওয়ায় নদী পেরোতে ভরসা স্রেফ নৌকো। সন্ধ্যার পরে বন্ধ হয়ে যায় সেই খেয়া পারাপার। মুর্শিদাবাদ থানার আইসি রাজা চক্রবর্তী বলেন, 'ওই সেতু নির্মিত হলে পুলিশ ও প্রশাসনের কাজ গতি পাবে।
ভাগীরথীর পশ্চিমপাড় লাগোয়া এলাকায় দুষ্কৃতীদের গ্রেপ্তার করতে হলে রাতের মাঝি ডেকে নৌকো নিয়ে অভিযান চালাতে হয়। পুলিশের গাড়ি নৌকোয় তুলে পশ্চিম পাড়ে পৌঁছানোর আগেই খবর পেয়ে চম্পট দেয় দুষ্কৃতী।' লালবাগে এই সেতু নির্মিত হলে মুর্শিদাবাদে ভাগীরথীর উপরে সেতুর সংখ্যা দাঁড়াবে চার।
উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে সংযোগকারী রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী সেতু, লালগোলা ও জঙ্গিপুরের মধ্যে যোগাযোগকারী সেতু ছাড়াও রয়েছে ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের উপরে সেতু। এখন ভাগীরথীর উপরে চতুর্থ সেতু তৈরি হলে লালবাগ মহকুমার সদর শহর মুর্শিদাবাদের সঙ্গে নবগ্রাম ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম হবে, যা এত দিন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। লালবাগের মহকুমাশাসক পূজা মিনা বলেন, 'ওই সেতু নির্মিত হলে নবগ্রাম সমেত পশ্চিম পাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের উপকার হবে।'
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই সেতু নির্মিত হলে খোশবাগে সিরাজদ্দৌলা ও তাঁর দাদু আলিবর্দি খানের সমাধি, রোশনিবাগে নবাব সুজাউদ্দৌলার সমাধি, কিরীটেশ্বরী মন্দির, জগদ্বন্ধু ধাম, আজিমগঞ্জে রানি ভবানির মন্দির ও গঙ্গেশ্বর শিবমন্দিরের মতো ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্য নাগালের মধ্যে আসবে। প্রতি বছর প্রায় ১৫-২০ লক্ষ পর্যটক মুর্শিদাবাদ ভ্রমণে আসেন। তাঁরা ভাগীরথীর পূর্বপাড়ে গাড়ি রেখে খেয়া পারাপার করে পশ্চিমপাড়ের দ্রষ্টব্য স্থান ঘুরে দেখেন।
ভাগীরথীর উপরে সেতু তৈরি হলে ওই সমস্যা মিটবে। রাজ্যের মন্ত্রী তথা মুর্শিদাবাদ বিধানসভার বিধায়ক গৌরীশঙ্কর ঘোষ বলেন, 'সেতু নির্মাণের ঘোষণার মধ্যে দিয়ে লালবাগবাসীর দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। এ জন্য মুখ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানাই। ওই সেতু তৈরি হলে প্যাকেজ ট্যুর হিসেবে ভাগীরথীর পশ্চিম পাড় বরাবর রাস্তা ধরে ১২ নম্বর জাতীয় সড়কে উঠে সেখান থেকে উত্তরপাড়া মোড় হয়ে শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ যাওয়া সহজ হবে। এতে পর্যটকরা উপকৃত হবেন।'