এই সময়: আর্দ্রতা, বাতাসের অস্থির অবস্থা এবং ঊর্ধ্বমুখী উত্তোলন শক্তি — তিন উপাদানই মজুত ছিল পুরোমাত্রায়। আর তার প্রভাবেই ভরা বর্ষায় অসময়ে কালবৈশাখীর সারপ্রাইজ় ভিজ়িট!
মঙ্গলবার দুপুর ২টোতেও কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার আকাশ দেখে মনে হয়নি, ৪৫ মিনিট পরে কী হতে চলেছে। ওই অল্প সময়ের মধ্যেই হাওড়ার ধূলাগড় থেকে কলকাতায় খিদিরপুরের মধ্যে অতি দ্রুত জমে উঠেছিল কিউমুলোনিম্বাস মেঘের স্তম্ভ।
কর্মব্যস্ত শহর চমকে উঠেছিল ভয়াবহ বজ্রপাতের শব্দে। তারপরেই সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এসেছিল। ততক্ষণে গাড়ির শব্দকে ছাপিয়ে শহর কাঁপতে শুরু করেছে পর পর মেঘের গর্জন ও বজ্রপাতে। আরও কয়েক মিনিট পরে তার সঙ্গে যোগ হয় তুমুল বৃষ্টি ও তীব্র ঝড়ের শব্দ।
বেলা ২টো ৪৫ থেকে ৩টে ৪৫ পর্যন্ত কলকাতা মরশুমের অষ্টম কালবৈশাখীর সাক্ষী থাকল। আলিপুর হাওয়া অফিসের রিপোর্ট অনুযায়ী, এ দিন শহরে বাতাসের সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় ৭৫ কিমি। আবহবিদরা জানিয়েছেন, এই এক ঘণ্টায় শুধু মধ্য কলকাতায় ২০০–র বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে।
বর্ষাকাল শুরু হয়ে গেলে আর কালবৈশাখী হয় না — এমন একটা ধারণা আছে আমাদের অনেকের। কিন্তু সেই ধারণাকে নস্যাৎ করে দিল মঙ্গলবারের এই ঘটনা। কিন্তু আবহাওয়া বিজ্ঞানের দিক থেকে দেখলে এই ঘটনা একেবারেই ‘অঘটন’ নয়’, এমনটাই মন্তব্য আলিপুর হাওয়া অফিসের অধিকর্তা হবিবুর রহমান বিশ্বাসের।
মঙ্গলবার প্রকৃতির যে তাণ্ডবে শহর ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল, তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কাগজে–কলমে বর্ষাকাল শুরু হয়ে গেলেও এ বার এখনও টানা বৃষ্টি হচ্ছে না। ভ্যাপসা গরম রয়েছে। ফলে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ খুব বেশি, বায়ুমণ্ডল অস্থির এবং গরমের জন্য বাতাসের নীচের স্তর ক্রমাগত উপরে এবং উপরের স্তর নীচে আসা–যাওয়া করছে। ফলে বাতাসের ঊর্ধ্বমুখী উত্তোলন শক্তি যথেষ্ট। এই সব ক’টি উপাদান মিলিয়েই কালবৈশাখীর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।’
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা বলেন, ‘এ দিন কিউমুলোনিম্বাস মেঘের যে স্তম্ভ তৈরি হয়েছিল, তার উচ্চতা অন্তত ১৪ কিলোমিটার ছিল। হাওড়ার ধুলাগড় থেকে কলকাতার খিদিরপুরের উপরেই প্রধানত এই মেঘটা জমেছিল। সেই কারণেই বজ্রপাতের চরমতম অভিঘাত পেয়েছিল মধ্য কলকাতা।’
রবীন্দ্র জানিয়েছেন, এ দিন মেঘের যে স্তম্ভ তৈরি হয়েছিল, তাতে বেশ কিছুক্ষণ একই সঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ (আপড্রাফট) এবং নিম্নমুখী বায়ুপ্রবাহ (ডাউনড্রাফট) চলছিল। এই পর্যায়েই ঝড় সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিপজ্জনক হয়। তখন একই সঙ্গে বজ্রপাত, প্রবল বৃষ্টি — কখনও শিলাবৃষ্টি এবং ঝোড়ো হাওয়া দেখা দেয়। আপড্রাফট ঝড়কে উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু সরবরাহ করে শক্তি জোগায় এবং ডাউনড্রাফট তীব্র বৃষ্টির কারণ হয়।
মঙ্গলবার দেড় ঘণ্টার মধ্যে শহরে ৫৯ মিমি–র বেশি বৃষ্টিই বুঝিয়ে দেয়, কত শক্তিশালী সিস্টেম তৈরি হয়েছিল শহরে। হাওয়া অফিস জানাচ্ছে, এই মরশুমে মঙ্গলবার দুপুরের চেয়ে বেশি গতিতে ঝড়ের নজির মাত্র একটাই রয়েছে। ২৯ মে শহরে ঘণ্টায় ৮৮ কিমি বেগে ঝড় হয়েছিল। আবহবিদরা জানিয়েছেন, এই সপ্তাহে কলকাতা–সহ দক্ষিণবঙ্গে ঝড়বৃষ্টির আবহ বজায় থাকবে।