এই সময়: তৃণমূল জমানায় দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই জানিয়ে দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। এ বার এই লক্ষ্যে বিধানসভার চলতি অধিবেশনে বিল এনে নয়া আইন করতে চলেছে তাঁর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। এই আইনে দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং নিলাম করার বন্দোবস্ত থাকবে বলেও মঙ্গলবার বিধানসভায় ঘোষণা করেছেন শুভেন্দু। সরাসরি কারও নাম না–করে তাঁর হুঁশিয়ারি, এই আইন কার্যকর হলে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে যাঁরা রাজপ্রাসাদ তৈরি করেছেন, সেখানে ফ্লাইওভারে নীচে বসবাসকারীদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে।
বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণের উপরে বিতর্কের জবাবি ভাষণে মঙ্গলবার দুর্নীতির মোকাবিলায় শুভেন্দুর স্পষ্ট বার্তা, ‘এই অধিবেশনেই বিল আসবে। সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করব। নিলাম করব। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে যে প্রাসাদগুলি রয়েছে, সেখানে ফ্লাইওভারের নীচে যাঁরা থাকেন, তাঁদের রাখব।...তোলাবাজ, লাল–চুল কানে–দুল এক জনও জেলের বাইরে থাকবে না।’
বীরভূমের পাথর খাদানের সব টাকা সরকারি কোষাগারে না গিয়ে একাংশ ক্যামাক স্ট্রিটে যেত বলেও শুভেন্দু তাঁর জবাবি ভাষণে অভিযোগ করেছেন। তিনি নির্দিষ্ট ভাবে কারও নাম না করলেও হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট অথবা ক্যামাক স্ট্রিটের উল্লেখ করে কোন কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে ইঙ্গিত করেছেন, তা সহজেই অনুমান করা যায় বলে বিজেপির বিধায়কদের পর্যবেক্ষণ। এই বিষয়ে কালীঘাটের তৃণমূলের মুখপাত্র তথা বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ বিধানসভার প্রেস কর্নারে মঙ্গলবার বলেছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী যদি নাম করে কিছু বলতেন, তখন এই বিষয়ে আলোচনার সুযোগ থাকত। কিন্তু উনি কারও নাম করেননি। এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করব না।’
বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে গেরুয়া শিবিরের নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা যাঁরা পাচ্ছেন, তাঁরা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’য় অন্তর্ভুক্ত হবেন। কিন্তু বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’য় কারা সুবিধা পাবেন, তার নির্দিষ্ট মাপকাঠি করে দিয়েছে।
রাজ্যপালের ভাষণের উপরে বিতর্কে তৃণমূলের কালীঘাট শিবিরের বিধায়ক আলিফা আহমেদ–সহ কয়েকজন প্রশ্ন তোলেন, কেন বিজেপি সরকার নির্বাচন পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে? শুভেন্দু এর জবাব দিতে গিয়েই তৃণমূল জমানার দুর্নীতির প্রসঙ্গে ঢুকে সরাসরি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেন। শুভেন্দু একাধিক কাগজ দেখিয়ে বলেন, ‘বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনে (বিজিবিএস) ফিকি–কে (বণিক সংগঠন) ৩২৪.৭৩ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এই দেখুন, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সই। এটা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এটা কি উনি করতে পারেন? প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ফিকিকে এই ৩২৪ কোটি টাকা দিয়েছেন।’
শুভেন্দু বোঝাতে চেয়েছেন, দুর্নীতির অভিযোগ থাকার কারণে তৃণমূল জমানার প্রকল্পগুলি নিয়ে বিশদ খোঁজখবর করা হচ্ছে। শুভেন্দুর এই অভিযোগ নিয়ে প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি। এই প্রসঙ্গে কুণাল বলেছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী যাঁকে নিয়ে অভিযোগ করেছেন, তিনি যতক্ষণ কিছু না বলছেন, ততক্ষণ এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে পারব না। আমার কাছে এই বিষয়ে কোনও তথ্য নেই।’
বিজিবিএস আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ তোলার পাশাপাশি শুভেন্দু ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘বার্ধক্য ভাতা’, ‘মেধাশ্রী’ ‘জয় জোহার’ প্রকল্পে তৃণমূল জমানায় শুধু মুর্শিদাবাদ জেলার ডোমকল ব্লকে কী পরিমাণ অনিয়ম হয়েছে, সেই তথ্য তুলে ধরেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই ভাবে ডোমকলে ৩০৭৬টি অ্যাকাউন্টে বার্ধক্য ভাতার টাকা ঢুকেছে। মেধাশ্রী প্রকল্পে ২১৫টি অ্যাকাউন্টে টাকা গিয়েছে। শিক্ষাশ্রীতে ৭১৫টি অ্যাকাউন্টে এবং জয় জোহার প্রকল্পে ২২৩টি অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকেছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে ৩০ লক্ষ এমন অ্যাকাউন্ট পেয়েছি। টাকা লুট হয়েছে। সবে তো শুরু হয়েছে, একটা চোরকেও ছাড়া হবে না।’
কাদের ছাড়া হবে না, তার কিছু নাম শুভেন্দু খোলাখুলি বিধানসভায় উল্লেখ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘বিচার হবে, হিসাব হবে, শাস্তি হবে। জাহাঙ্গির, শাহজাহান, শওকত, সোনা পাপ্পু, দিলীপ মণ্ডল— কেউ বাঁচতে পারবেন না। আরও কঠোর আইন হবে।’ বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী তৃণমূল শিবির প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের বিরোধিতা করতে চাইছে না। রাজ্যপালের ভাষণের উপরে বিতর্কে ঋতব্রত বলেছেন, ‘ভুঁইফোড় মাফিয়ার দুর্নীতির খেসারত আমাদের দিতে হচ্ছে। কিন্তু চার্টার্ড মাফিয়ার কৃতকর্মের দায় সাধারণ তৃণমূল কর্মীদের কেন দিতে হবে?’
ঋতব্রত শিবিরের দাবি, দুর্নীতি অথবা কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ তুলে তৃণমূলের নিচুতলার নেতা–কর্মীদের কাছ থেকে জরিমানা নেওয়া বন্ধ হোক। বিরোধী দলনেতার সংযোজন, ‘নিরপরাধদের যেন শাস্তি দেওয়া না হয়। যারা জরিমানা নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে আইন তৈরি হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য অভিযুক্তের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বন্দোবস্ত রাখা হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতিতে জড়িতদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও নিলাম করার বন্দোবস্ত করতে যে আইন শুভেন্দু করতে চলছেন, তা দুর্নীতি মোকাবিলায় সরকারের বড় অস্ত্র হতে পারে বলে গেরুয়া শিবির মনে করছে।