• বাজেটে ব্রাত্য দেউচা-পাচামি আতান্তরে খনি প্রকল্পে জড়িতরা
    বর্তমান | ২৪ জুন ২০২৬
  • পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: দেউচা-পাচামি প্রস্তাবিত কয়লা খনি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এবার কোনদিকে? যাকে সামনে রেখে রাজ্যে শিল্পায়নে জমি অধিগ্রহণ নীতির নয়া মডেল আমদানি করেছিল পূর্বতন তৃণমূল সরকার। সোমবার বিজেপি সরকারের বাজেটের পর সেই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল। কেননা, বাজেটে দেউচা-পাচামি নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। স্বাভাবিকভাবেই হতাশার গভীরে ডুব দিয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর জমিতে গড়ে উঠতে চলা এই মেগা প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষজন। বিশেষ করে জমিহারাদের উৎকণ্ঠা চরমে। 

    অথচ, বাজেটে শুভেন্দুর সরকার নিরাশ করেনি বীরভূম জেলাবাসীকে। সিউড়ি সুপার স্পেশালিটিকে মেডিকেল কলেজে উন্নীত করা, ময়ূরাক্ষী নদীর তিলপাড়া ব্যারাজে নতুন চার লেনের সেতু তৈরি, জেলার ঐতিহ্যবাহী তীর্থক্ষেত্রগুলিকে নিয়ে হেরিটেজ পর্যটন সার্কিট গড়া সহ একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে বাজেটে। কিন্তু, দেউচা-পাচামির মানুষকে কোনো সুখবর দেননি স্বপনবাবু। তা হলে কি খনি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত? প্রথম থেকেই খনি বিরোধী আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন আদিবাসী অধিকার মহাসভার আহ্বায়ক জগন্নাথ টুডু। মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘ভেবেছিলাম নতুন সরকার দেউচা-পাচামি নিয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট ভাবনার কথা ঘোষণা করবে। কিন্তু বাজেটে বিষয়টি সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ দেখে আমাদের চূড়ান্ত অবস্থান ঠিক করব।’ একই সুর পাঁচামির গ্রামসভা সমন্বয় হুল কমিটির আহ্বায়ক সুশীল মুর্মুর গলাতেও। তাঁর কথায়, ‘মানুষের কাছে প্রত্যাখ্যাত এই কয়লা খনি প্রকল্প বাতিল করে এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জল ও রাস্তার উন্নয়নে কোনো বিকল্প বার্তা সরকার দেবে, এই আশায় ছিলাম। আমরা আশাহত।’ 

    দেউচা-পাচামি শুধুমাত্র মেগা খনি প্রকল্প ছিল না। এই প্রকল্পকে সামনে রেখে জমি অধিগ্রহণ নীতির আমূল বদল এনেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। সেই মতো ৩ হাজার ৪০০ একর জমি চিহ্নিত করে অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছিল। প্রায় চারশো একর জমি কেনাও হয়। উচ্ছেদের খাঁড়া ঝুলছিল ৩০১০টি পরিবারের ওপর। তাদের মধ্যে ১০৮৩টি আদিবাসী পরিবার। গত বছর ঘটা করে মথুরাপাহাড়ি ও চাঁন্দার মাঝে ব্যাসল্ট বা কালো পাথর তোলার জন্য ১২ একর জমিতে খনন কাজ শুরু হয়েছিল। আজ সেই এলাকা খাঁ খাঁ করছে। 

    সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন জমিদাতারা। ইতিমধ্যে দু’ হাজারেরও বেশি মানুষকে চাকরি ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। তা নিয়েও রয়েছে বিস্তর গড়মিলের অভিযোগ। কোথাও জোর করে জমি নেওয়া, কোথাও আবার বহিরাগতদের জমির ভুয়ো মালিক সাজিয়ে চাকরি ও টাকা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত রবিবারই সোঁতসালে জমায়েত হয়ে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিলেন ভুক্তভোগীরা। জমিদাতা সেখ মিনাজউদ্দীনের বক্তব্য, ‘এলাকার প্রায় তিন হাজার জমিদাতা এখনও ধন্দে। ১৮০০’র বেশি মানুষের নথিপত্র পিডিসিএলে আটকে রয়েছে। জেলা প্রশাসন বলেছিল, বাজেটের জন্য অপেক্ষা করতে। কিন্তু বাজেটে কোনো আশার আলোই তো দেখলাম না।’

    বাজেটে স্পষ্ট আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছেন না জমি বিনিময়ে চাকরি প্রাপকরাও। দেউচা-পাচামি বাস্তবায়িত না হলে তাঁদের চাকরি থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়ে ধন্দে পড়েছেন সকলেই। এমনিতেই বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ তুলেছিলেন, জমিহারাদের চাকরি দেওয়ার নামে বড় কেলেঙ্কারি হয়েছে। স্থানীয় আদিবাসী বা যোগ্য মানুষদের বদলে চাকরি দেওয়া হয়েছে তৃণমূল নেতাদের আত্মীয় ও সহযোগীদের। জেলার এক প্রভাবশালী সাংসদের বহু আত্মীয়ও ঘুরপথে চাকরি বাগিয়েছেন বলে অভিযোগ। বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই পাচামির সাধারণ চাকরি কেলেঙ্কারির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তুলেছেন।
  • Link to this news (বর্তমান)