ঐতিহাসিক লোহাগড় দুর্গে ট্রেকিংয়ে যাওয়া পুনের ব্যবসায়ী কেতনের মৃত্যু দুর্ঘটনা বলে মনে হলেও পরে তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। হবু বর ২৬ বছর বয়সি কেতন বিশাল আগরওয়ালকে পাহাড় থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে খোদ বাগদত্তা এবং তাঁর প্রেমিক চেতন চৌধরীর বিরুদ্ধে। কিন্তু কী ভাবে কিনারা হল খুনের ঘটনা? পুলিশের মতে, প্রবল গরমে হুডি পরে থাকাই চিহ্নিত করে দেয় খুনিদের। পুলিশের দাবি তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কেতনের বাগদত্তা সিয়া গোয়েল এবং অভিযুক্ত প্রেমিক চেতন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৮ জুন কেতন আগরওয়াল লোহাগড় দুর্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন তাঁর বাগদত্তা সিয়া গোয়েলের সঙ্গে। সেখানে ছবি তোলার সময় আচমকা ৪৫০ ফুট গভীর খাদে পড়ে যান কেতন। প্রথমে ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলেই মনে করা হয়েছিল। সিয়া পুলিশকে জানিয়েছিলেন, পা পিছলে পড়ে গিয়েছেন কেতন। কিন্তু পুনে গ্রামীণ পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট সন্দীপ সিং গিল জানান, কেতন একজন অত্যন্ত দক্ষ ট্রেকার ছিলেন। তাই পা পিছলে পড়ে যাওয়ার তত্ত্ব নিয়ে পুলিশের মনে প্রথম থেকেই প্রশ্ন ছিল। পরে পরিবারের সদস্যদেরও সন্দেহ হওয়ায় তদন্তের মোড় ঘুরে যায়।
তদন্তে সবচেয়ে বড় সূত্র হয়ে ওঠে সিসিটিভি-র ফুটেজ। দুর্গের টিকিট কাউন্টারের কাছে লাগানো একটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ১৮ জুন হুডি পরা একজনকে দেখা যায়। এর পরে ফুটেজে দেখা যায় দুর্গ এলাকায় প্রবল গরমের মধ্যেও হুডি পরা ওই ব্যক্তি কেতন ও সিয়ার পিছু নিচ্ছেন। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই কেতন খাদে পড়ে মারা যায়। এক তদন্তকারী আধিকারিক বলেন, ‘লোকটি শর্টস ও হুডি পরেছিল। হুডিটির সামনের অংশ এতটাই নিচে নামানো ছিল যে তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না। এছাড়াও, লোকটি হুডির উপরে একটি হেডসেট পরেছিল। অন্য একটি ফুটেজ ক্লিপে আমরা লক্ষ্য করেছি, সিয়া হঠাৎ পিছনে তাকান এবং তখনই হুডি পরা লোকটি হঠাৎ বসে পড়ে।’ এখানেই তদন্তকারীদের সন্দেহ হয়— জুন মাসের আবহাওয়ায় এমন পোশাক কেন? ৩৩ ডিগ্রি গরমে কে হুডি পরে? এর পরে সেই ফুটেজ বিশ্লেষণ করেই উঠে আসে চেতন চৌধরীর নাম।
পুলিশের তদন্তে উঠে আসে যে, কেতনের মৃত্যুর দিন সারাক্ষণ বন্ধ ছিল চেতন চৌধরীর ফোন। তিনি তাঁর ফোন অফিসে ফেলে রেখে গিয়েছিলেন এবং তার ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছিল। এতে পুলিশের সন্দেহ আরও গভীর হয়। লোকেশন ট্র্যাক করার বিষয়টি বন্ধ করতেই এমন সাবধানতা বলে অনুমান।
পুলিশের দাবি, এটি হঠাৎ করে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়। দীর্ঘদিন ধরেই পরিকল্পনা করেছে কেতন বিশাল আগরওয়ালের হবু স্ত্রী ও তাঁর প্রেমিক। তদন্তে জানা গিয়েছে, এর আগেও অন্তত তিনবার কেতনকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। একবার নাকি সাপ থেকে বাঁচানোর অজুহাতে ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রতিবারই পরিকল্পনা সফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত লোহাগড় দুর্গে নিয়ে গিয়ে সুযোগ বুঝে তাঁকে খাদে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
তদন্তকারীরা আরও জানতে পেরেছেন, সিয়া ও চেতনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং কেতনের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হওয়ার বহু আগে থেকেই দু’জন যোগাযোগ রাখছিলেন। তদন্তকারীদের মতে, সিয়ার কল রেকর্ড থেকে চেতনের সঙ্গে তার একটানা ও ঘনঘন যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। দু’জনের ফোনে মিলেছে চ্যাটও। এমনকী বিদেশ সফর ও একাধিক ঘটনার সূত্র ধরেও তদন্ত এগিয়েছে। পুলিশের মতে, সিয়া চেতনের সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর জন্যেই কেতনকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল এবং দুর্ঘটনা বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
পুলিশ সূত্রে খবর, জেরার সময়ে চেতনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কেন তারা পালিয়ে যাওয়ার কথা না ভেবে কেতনকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়? জবাবে চেতন জানিয়েছে,পরিবারের ঠিক করা ছেলের সঙ্গে বাগদান ভেঙে সিয়া চেতনের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিল না, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল এমনটা করলে পরিবারের প্রতি অসম্মান করা হবে।
উল্লেখ্য, লোহাগড় দুর্গ পুনে জেলার অন্যতম জনপ্রিয় ট্রেকিং গন্তব্য এবং প্রতি বছর বহু পর্যটক সেখানে যান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পর্যটন ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।