• জোড়া ফুল কার? এখন নির্বাচন কমিশনের জোড়া ডানা পরীক্ষায় ঝুলে মমতার ভাগ্য
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ২৫ জুন ২০২৬
  • মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের হাতে গড়া দলটার নাম-প্রতীক আজ বিপন্ন। বিধানসভা ভোটে হারের পর থেকে তৃণমূলের (AITC) ভেতরে যা চলছে, তা এখন আর নিছক দলীয় কোন্দল নয়। এটা এখন একটা আইনি লড়াই, সাংবিধানিক লড়াই। লড়াইয়ের ময়দান এখন নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)। কারা আসল, সেটা ঠিক হবে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে। যার পোশাকি নাম, টু-উইং টেস্ট (Two-Wing Test) বা জোড়া ডানা পরীক্ষা।

    ১৯৬৮ সালের নির্বাচনী প্রতীক বিধির (Election Symbols Reservation and Allotment Order, 1968) ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনও দলে ভাঙন দেখা দিলে নির্বাচন কমিশন দুটো দিক বিচার করে ঠিক করে কোন পক্ষটি ‘আসল’ দল।

    প্রথম ডানা: বিধায়িকা শাখা (Legislative Wing)। মানে, কত জন সাংসদ ও বিধায়ক কোন পক্ষে।

    দ্বিতীয় ডানা: সাংগঠনিক শাখা (Organisational Wing)। মানে, কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি, জাতীয় কমিটির সদস্যরা কোথায়।

    এই দুই পরীক্ষায় যে পক্ষ এগিয়ে, সে পাবে দলের নাম আর প্রতীক।

    তৃণমূলের ক্ষেত্রে প্রতীকটি হল সেই চেনা ‘জোড়া ঘাসফুল’।

    বিদ্রোহী পক্ষের হাতে এই মুহূর্তে আনুমানিক ৭১ শতাংশ সাংসদ এবং ৮১ শতাংশ বিধায়কের সমর্থন রয়েছে বলে দাবি। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী পক্ষ দাবি করছে, ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬৫ জন তাদের পাশে।

    ২২ জুন কলকাতার নিউটাউনে একটি হোটেলে বৈঠক ডেকে বিদ্রোহী পক্ষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে মধ্য হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়কে নতুন সভাপতি ঘোষণা করেছে। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অপসারিত হয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও।

    এবং সামগ্রিকতার নিরিখে এটা বলতেই হবে, কাগজ-কলমে বিদ্রোহীরা অনেকটাই এগিয়ে।

    কিন্তু বাস্তব ছবিটা এত সহজ নয়।

    লোকসভায় তৃণমূলের ২০ জন সাংসদ আনুষ্ঠানিকভাবে এনডিএ-তে (NDA) যোগ দিয়েছেন। এই পদক্ষেপে তাঁদের দাবির বৈধতা নষ্ট হয়ে যায়। বিদ্রোহীদের মধ্যে একটি অংশ, যেমন শতাব্দী, কাকলি, সুদীপ জুন মালিয়া, সায়নী ঘোষ, মিতালি বাগ ইত্যাদিদের সম্মিলিত সাংসদ গোষ্ঠী সম্পূর্ণ আলাদা হতে চান।নতুন দলের NCPI-এ সামিল হয়ে। অন্য অংশ, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আসল টিএমসি’ গ্রুপ, নির্বাচন কমিশনের লড়াই লড়তে আগ্রহী।

    অর্থাৎ বিদ্রোহী শিবিরও একজোট নয়।

    অন্যদিকে মমতার পক্ষ নিজেই স্বীকার করেছে, তাদের তালিকাটি ‘মূল কিন্তু সংখ্যালঘু (original but minority)’। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া নথিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সভাপতি ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাধারণ সম্পাদক পদে রেখেই সংশোধিত কমিটির তালিকা পাঠানো হয়েছে। এই ‘মূল কিন্তু সংখ্যালঘু’ স্বীকারোক্তিটি আসলে একটি বড় রাজনৈতিক দুর্বলতার প্রকাশ্য স্বীকৃতি।

    প্রতীকের লড়াইয়ে এখন যুক্ত হয়েছে টাকার লড়াই। তৃণমূলের তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোট প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা জমা আছে বলে জানা গেছে। পুলিশ ওই অ্যাকাউন্টগুলোয় ‘ডেবিট ফ্রিজ (Debit Freeze)’ করেছে, অর্থাৎ টাকা তোলা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

    নির্বাচন কমিশন যখন ঠিক করবে কোন পক্ষটি ‘আসল’ তৃণমূল, সেই রায় হাতে নিয়ে সিভিল কোর্টে গিয়ে অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ দাবি করতে হবে। অর্থাৎ প্রতীকের লড়াইটা আসলে টাকার লড়াইও।

    এই পথ নতুন নয়। শিবসেনায় (Shiv Sena) শিন্দে-ঠাকরে লড়াইয়ে এবং এনসিপিতে (NCP) অজিত পাওয়ার-শরদ পাওয়ার দ্বন্দ্বে নির্বাচন কমিশন এই একই পথ ধরেছিল।

    সমাজবাদী পার্টির (SP) ক্ষেত্রে অখিলেশ ২২৮ জন বিধায়কের মধ্যে ২০৫ জনের হলফনামা জমা দিয়েছিলেন। জাতীয় কার্যকরী সমিতির ৪৬ জনের মধ্যে ২৮ জনের সমর্থন দেখিয়েছিলেন। মুলায়ম শুধু নিজের হলফনামা দিতে পেরেছিলেন। কমিশন অখিলেশকে দল আর সাইকেল প্রতীক দিয়েছিল।

    শিক্ষাটা স্পষ্ট। সংখ্যা জরুরি, কিন্তু শুধু বিধায়ক-সাংসদ নয়। সাংগঠনিক কাঠামোয় আধিপত্যও প্রমাণ করতে হবে।

    সংখ্যায় পিছিয়ে থাকলেও মমতার হাতে কিছু তাস আছে। প্রথমত, দলের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। দ্বিতীয়ত, আইনি লড়াইয়ে অভিজ্ঞদের দাবি, দলের সাংবিধানিক কাঠামোও তাঁরই পক্ষে। তৃতীয়ত, ২০০৩ সালে দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-Defection Law) থেকে ‘বিভাজনের’ সুরক্ষা তুলে নেওয়া হয়েছে। তার মানে, নির্বাচন কমিশনে জিতলেও বিধায়কদের আসন রক্ষার প্রশ্নটা আলাদাভাবে স্পিকারের কাছে যাবে।

    অর্থাৎ বিদ্রোহীরা দলের নাম পেলেও বিধায়ক পদ হারাতে পারেন।

    তৃণমূলের এই সংকট এখন আর শুধু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির গল্প নয়। এটা ভারতের গণতন্ত্রের একটি বড় পরীক্ষা। একটি আঞ্চলিক দল কীভাবে নির্বাচনে হারের পর ভেঙে পড়ে, আর সেই ভাঙনের মধ্যে থেকে কে উঠে দাঁড়ায় তার নাম-প্রতীক-অর্থ নিয়ে, সেটা দেখবে সারা দেশ।

    জোড়া ঘাসফুল শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে? সেই উত্তর এখন নির্বাচন কমিশনের ফাইলে।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)