পুনের লোহাগড় দুর্গে কেতন আগরওয়ালের মৃত্যু যে নেহাত পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে হয়নি, তাঁকে পূর্বপরিকল্পিত ভাবে ঠেলে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে— এই বিষয়ে তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই নিশ্চিত। তবে এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত, সিয়া গোয়েলের প্রেমিক চেতন চৌধরীর ভূমিকা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কিছু প্রমাণ পেয়েছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত চেতনের পরিবারের দাবি, তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে। সিয়ার সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল ঠিকই, কিন্তু কেতনকে খুন তিনি করেননি। বরং ঘটনার সময়ে তিনি কেতনের থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়েছিলেন। সেখান থেকে কেতনকে ঠেলে ফেলে দেওয়া অসম্ভব।
চেতনের বাবা বাবুলাল চৌধরী দাবি করেছেন, তাঁর ছেলেকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। সংবাদসংস্থা ANI-কে তিনি বলেন, ‘চেতন আমাকে স্পষ্ট জানিয়েছে, পাহাড়ের খাদের ধারে কেতনের একদম কাছে দাঁড়িয়েছিল সিয়া। চেতন সেখান থেকে অনেক দূরে ছিল।’ তবে সিয়াই কেতনকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে কি না, সেই বিষয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
বাবুলাল জানিয়েছেন, সিয়ার সঙ্গে তাঁদের পরিচয় ছিল না। এই ঘটনার আগে চেতনের বাড়ির লোক তাঁকে চিনতেনই না, নাম পর্যন্ত শোনেননি। ওই দিন লোহাগড় দুর্গে যাওয়ার আগে চেতন তাঁর বাবাকে কিছু বলে যাননি। শুধু মাকে বলেছিলেন, তাঁর একটা মিটিং আছে। দুপুর ২টো-৩টের মধ্যে ফিরে আসবেন।
বাবুলালের আরও অভিযোগ, আটকের রাতে পুলিশ তাঁদের বিভ্রান্ত করেছিল। প্রথমে বলা হয়েছিল এটি একটি জালিয়াতির মামলা এবং চেতনকে জিজ্ঞাসাবাদের পরে দু’ঘণ্টার মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু রাতে তিনি থানায় গেলে বাবুলালকে পরের দিন সকালে আসতে বলা হয়। পরের দিন সকালে তাঁরা জানতে পারেন চেতনকে খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাবুলালের দাবি, তাঁর ছেলে এই কাজ করতেই পারে না।
চেতনের আইনজীবী, রাম সাহানেও পুলিশের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সংবাদসংস্থা PTI-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘FIR-এ এই হত্যাকণ্ডের পিছনে চেতনের নির্দিষ্ট কোনও ভূমিকার কথা স্পষ্ট করে বলা নেই। শুধুমাত্র সিয়ার প্রেমিক হওয়ার কারণেই তাঁকে এই খুনের মামলায় জড়ানো হয়েছে। পুলিশের হাতে চেতনের বিরুদ্ধে কোনও অকাট্য প্রমাণ নেই।’
তবে চেতনের বাবা ও তাঁর আইনজীবীর এই দাবি মিলছে না পুলিশের তদন্তের সঙ্গে। লোনাভালা গ্রামীণ পুলিশের সিনিয়র ইনস্পেক্টর দীনেশ তায়াড়ে জানিয়েছেন, ঘটনার দিন সিয়া ও কেতন পৌঁছনোর আগেই লোহাগড় দুর্গে পৌঁছে গিয়েছিল চেতন। যাতে পরে তাঁকে ট্র্যাক না করা যায়, তার জন্য নিজের মোবাইল ফোনটি সে বাড়িতে রেখে গিয়েছিল।
তাঁর উপরে পুলিশের সন্দেহ গিয়ে পড়ে মূলত CCTV ফুটেজ দেখে। পুলিশ জানিয়েছে, ১৮ জুন সকালে ওই এলাকার তাপমাত্রা ছিল ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই গরমের মধ্যেও CCTV ফুটেজে চেতনকে মাথা-ঢাকা ‘হুডি’ এবং হেডফোন পরা অবস্থায় দেখা যায়। আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান এই পোশাক দেখেই তদন্তকারীদের খটকা লাগে এবং তদন্তের মোড় ঘুরে যায়।
তাঁদের দাবি, সিয়া ও চেতন মিলেই এই হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিকল্পনামাফিকই কেতনের পাসপোর্ট গায়েব করে দিয়ে বালিতে প্রিওয়েডিং ফটোশুট ক্যানসেল করিয়েছিলেন তারা। ১৮ জুনের আগে, ১৪ জুনও কেতনকে একই ভাবে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা। তবে ওই দিন তাঁদের পরিকল্পনা সফল হয়নি।
একদিকে পরিবারের দাবি চেতন নির্দোষ। অন্যদিকে পুলিশের হাতে রয়েছে CCTV ফুটেজ, চেতনের মোবাইল ফোন বাড়িতে রেখে যাওয়ার মতো পারিপার্শ্বিক প্রমাণ। আপাতত সিয়া এবং চেতন দু’জনেই সাত দিনের পুলিশি হেফাজতে রয়েছে। পুলিশের দাবি, জেরায় তাঁরা দু’জনেই অপরাধ কবুল করেছে। এই প্রেমিক যুগল মিলে ঠিক কী ভাবে এই নৃশংস ছক কষেছিল, হেফাজতে টানা জেরার পরেই সেই সম্পূর্ণ সত্যি প্রকাশ্যে আসবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।