এই সময়, বর্ধমান: যে তোলাবাজির অভিযোগ এত দিন উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে, এ বার বিজেপির বিরুদ্ধে সেই তোলাবাজির অভিযোগ উঠল। আরও গুরুতর অভিযোগ, সেই তোলাবাজির টাকা দিতে না পেরে চাপের মুখে আত্মহত্যা করেছেন এক তৃণমূল নেতা।
অভিযোগ, বিজেপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি মেনে ২৩ লক্ষ টাকা দিতে না–পারায় বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন বর্ধমান–১ ব্লক তৃণমূল কংগ্রেস কমিটির সদস্য স্বরূপ রানা। তিনি বাঘার–১ পঞ্চায়েতের জগাদাবাদ গ্রামের পাচকুলার বাসিন্দা। তিনি জগদাবাদ সমবায় কৃষি উন্নয়ন সমিতি লিমিটেড–এ কাজ করতেন।
স্বরূপের পরিবারের অভিযোগ, মঙ্গলবার তিনি ওই সমবায়ের অফিসেই বিষ খান। তাঁকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। বুধবার সকালে তিনি মারা যান। পুলিশ সূত্রে খবর, স্বরূপের মৃত্যুর ঘটনায় তিন জনকে আটক করা হয়েছে। বিজেপির পূর্ব বর্ধমান জেলা নেতৃত্ব অবশ্য এই ঘটনার নিন্দা করেছেন। তাঁদের দাবি, রাজ্যে পালাবদলের পরে যাঁরা রাতারাতি গেরুয়া শিবিরে যোগ দিয়েছেন, সেই তৎকাল বিজেপির লোকেরা ওই তোলাবাজিতে যুক্ত।
মৃত তৃণমূল নেতার পরিবারের দাবি, সোমবার সকালে এলাকার বেশ কিছু বিজেপি নেতা বাড়ি গিয়ে অকারণে স্বরূপকে গালমন্দ করেন, হুমকি দেন। ওই রাতেই বিজেপির স্থানীয় অফিসে ডেকে পাঠিয়ে তাঁকে মারধরও করা হয়। স্বরূপের ভাই শ্যামল বুধবার অভিযোগ করেছেন, ‘দাদাকে বিজেপির শ্যামল হাজরা, সঞ্জয় খাঁ, সুকান্ত ঘোষ, গদাধর প্রামাণিক, কানাই খাঁ–সহ আরও অনেকে ওদের অফিসে মারধর করে বলেছিল, ৫০ লাখ টাকা জরিমানা দিতে হবে। শেষে রফা করে ওরা ২৩ লাখ টাকা দাবি করে। রাতে বাড়িতে ফিরে খাওয়াদাওয়াও করেনি। বৌদির কাছ থেকে জানতে পেরেছি, রাতে ঘুমোয়নি।’
শ্যামল বলেন, ‘মঙ্গলবার সকালে দাদা কাজে চলে যায়। অফিসের ভিতরেই বিষ খায়। আমরা জানতে পেরে অফিস থেকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করি। কিন্তু দাদা বাঁচল না। দাদা তৃণমূল করত, সেটাই ওর অপরাধ ছিল।’ কাঁদতে কাঁদতেই তিনি অভিযোগ করেন, ‘ওরা দাদাকে হুমকি দিয়েছিল, ২৩ লাখ টাকা না–দিলে বাড়িতে অত্যাচার চালানো হবে। ওর মেয়ে-বউকে তুলে নিয়ে যাবে। দাদাকে দিয়ে জোর করে একটা মুচলেকাও লিখিয়ে নেয় ওরা। দাদা এই ভয়েই নিজেকে শেষ করে দিল।’
স্বরূপ ২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বর্ধমান–১ পঞ্চায়েত সমিতির খাদ্য কর্মাধ্যক্ষ এবং ২০১৮ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত মৎস্য কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন। তাঁর প্রতিবেশী সন্ধ্যা হাজরা এ দিন অকপটেই বলেন, ‘আমাদের পরিবারের সবাই বরাবর বিজেপি করে। আমাদের উপরে কোনও দিন স্বরূপদা অত্যাচার করেনি। আমাদের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার–সহ অন্য কাজও করে দিয়েছে। এটা ওদের দল থেকে বিজেপিতে ঢোকা লোকরাই করেছে। খুব অন্যায় হয়েছে।’
স্বরূপের স্ত্রী রেবা রানা বলেন, ‘আমার স্বামীর সম্পর্কে আপনারা খোঁজ নিন। গোটা গ্রামের কেউ বলবে না, আমার স্বামী কোনও দিন কারও ক্ষতি করেছে। তৃণমূল করলেও কোনও দিন কারও সঙ্গে জোর গলায় কথা বলেনি।’ বলতে বলতে কান্নায় গলা বুজে আসে তাঁর। তার মধ্যেই কোনও রকমে বলেন, ‘আমার এত বড় ক্ষতি করে দিল! আমি এখন এই ১০ বছরের মেয়েটাকে নিয়ে কী ভাবে বাঁচব। যাদের জন্য আমার স্বামীর এই অবস্থা হলো, তাদের কঠোর শাস্তি চাইছি।’
তবে ঘটনায় যুক্ত বলে যাঁদের নাম বলেছেন স্বরূপের ভাই শ্যামল, তাঁদের তৎকাল বিজেপি বলেই দাবি করেছেন পদ্ম–নেতৃত্ব। বর্ধমান–১ ব্লকের বিজেপির মণ্ডল সভাপতি রাজকুমার সাউ এ দিন বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়েছি। ৪ (মে) তারিখের পরে যারা বিজেপি হয়েছে, সেই তৎকাল বিজেপির লোকরা এই কাজে জড়িত। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, কেউ ছাড় পাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি সাত–আট দিন আগেই স্বরূপদার সঙ্গে দেখা করে মাথা উঁচু করে বাইরে বেরোতে বলে এসেছিলাম। কোথাও কোনও সমস্যা হলে জানাতে বলেছিলাম। সোমবার যখন এত কিছু হলো, তখন কেন একবার জানালো না! সেটাই খারাপ লাগছে। তা হলে আজকের এই দিন দেখতে হতো না।’
বিজেপির জেলা মুখপাত্র কল্যাণকুমার মাঝির কথায়, ‘আমরা ওঁর পরিবারকে সমবেদনা জানাচ্ছি। সালিশি সভায় বসে আর্থিক জরিমানা করা আমাদের পার্টির নিয়ম নয়। ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশকে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে বলা হয়েছে। ওই এলাকায় আমাদের পার্টির মণ্ডল সভাপতি ওঁর পরিবারের পাশে রয়েছেন।’ এই সঙ্গেই তিনি দাবি করেছেন, ‘একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা পার্টি খারাপ বলে কেউ কেউ যা প্রচার করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তা একেবারেই ঠিক নয়।’
জানা গিয়েছে, দেওয়ানদিঘি থানায় স্থানীয় বেশ কয়েক জনের নামে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন শ্যামল। তাঁদের সবাই বিজেপি কর্মী। কয়েক জন দলের পদেও রয়েছেন।