এই সময়: বিপর্যয় আগেও হয়েছে অনেকবার। কখনও ভেঙে পড়েছে পোস্তা ফ্লাইওভার, কখনও ভেঙেছে গার্ডেনরিচের নির্মীয়মাণ বাড়ি। ধ্বংসস্তূপে কুড়ে কুড়ে মৃত্যুর জন্য প্রহর গুনেছেন মানুষ। অক্লান্ত পরিশ্রম করেও তাঁদের উদ্ধার করা যায়নি। কারণ, এ ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য না ছিল উদ্ধারের মতো প্রশিক্ষণ, না ছিল পরিকাঠামো। বুধবার তারাতলায় গোডাউন ভেঙে পড়ার পরে অবশ্য পুরোনো সেই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হতে দেয়নি নতুন সরকার। সেনা, পুলিশ, পুরসভা, জাতীয় এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী থেকে স্বাস্থ্য, দমকল, পরিবহণ— সব বিভাগের এক অভূতপূর্ব টিমওয়ার্কে আটকে পড়া শ্রমিকদের বেশির ভাগেরই প্রাণ বাঁচানো গিয়েছে।
বুধবার দুপুর ১২টার কিছু পরে তারাতলায় ভেঙে পড়ে ওই গোডাউন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছে কলকাতা পুলিশ, দমকল ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী কাজ শুরু করে। নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘ওখানে পুলিশ কমিশনার, জয়েন্ট সিপিরা পৌঁছে আমাদের জানান, আর্মি ডাকলে ভালো হয়। কারণ ক্রেন দিয়ে স্ট্রাকচারকে তুলতে গেলে আরও বেশি মানুষ মারা যেতে পারে। মেশিন দিয়ে স্ট্রাকচার কেটে তবে ভিতরে ঢুকতে হবে।’
এরপরেই সময় নষ্ট না করে বেলা আড়াইটে নাগাদ মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল সেনাবাহিনীর সঙ্গে কথা বলেন। শুভেন্দুর কথায়, ‘অফিশিয়াল প্রসিডিওর হওয়ার আগেই সোয়া তিনটের মধ্যে সেনা জওয়ানরা উদ্ধার কাজ শুরু করে দেন। না হলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তো। উদ্ধার করা শ্রমিকদের গ্রিন চ্যানেল দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসার ব্যবস্থাও করা হয়। সঙ্গ দেয় এনডিআরএফ (জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী)। পুলিশ, পুরসভা, দমকল, রাজ্যের সিভিল ডিফেন্স ছিলই।’ সকলের প্রচেষ্টায় এ দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত মোট ২১ জনকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
বিগত সরকারের আমলে গত ১৫ বছরে একাধিক বিপর্যয়ে কেন্দ্রীয় কোনও এজেন্সিকে ডাকা হয়নি। যার শেষ নজির গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে গার্ডেনরিচে নির্মীয়মাণ বাড়ি ভেঙে পড়ার ঘটনা। শুভেন্দুর কথায়, ‘গার্ডেনরিচের বাড়ি চাপা পড়ে ১৩ জন মানুষ আটকে পড়েছিলেন। তাঁদের কাউকে বাঁচানো যায়নি। ৭২ ঘণ্টা ধরে উদ্ধার কার্য চললেও আর্মি বা এনডিআরএফকে খবর দেওয়া হয়নি।’
মুখ্যমন্ত্রীর আক্ষেপ, ‘রাজ্যে পরিকাঠামোই তো ছিল না। এই যে লোহা কেটে ভিতরে ঢোকা হয়েছে, সেটা কাটার মতো যন্ত্র আর্মির কাছেই রয়েছে।’ কিন্তু এ দিন খবর পাওয়ার পর সেই কাঙ্খিত সমন্বয় গড়ে তুলতে সরকার যে রাজনীতি নয়, মানুষের প্রাণের কথা ভেবেছে সেটা স্পষ্ট মুখ্যমন্ত্রীর কথাতেই। তাঁর অভিযোগ, ‘আগে তো এ সব হতো না। বলা হতো আর্মি, এনডিআরএফকে ডাকা যাবে না। কে কোন দলের, কে কোন সরকারের লোক— এ সব দেখা হতো।’
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুপুর ৩টের কিছু পরে শ্রমিকদের উদ্ধারের পাশাপাশি চাপা পড়ে থাকা আরও ১২-১৫ জনের সঙ্গে এনডিআরএফ এবং আর্মি সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরে জল এবং অক্সিজ়েন দেওয়ার ব্যবস্থাও করেছে। শুভেন্দু বলেন, ‘এই দুর্ঘটনায় ছ’টা স্পেশাল উইং এক সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করেছে।’ এ দিন দুপুরে চিনার পার্কের বাড়িতে বসে বিপর্যয়ের খবর পান মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকেই ফোনে চার মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, শারদ্বত মুখোপাধ্যায়, ইন্দ্রনীল খাঁ, কৌশিক চৌধুরিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর নির্দেশ দেন তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বতকে আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বলেন।
উদ্ধারকাজ দ্রুত এগোতে এ দিন ঘটনাস্থলে বেশ কয়েকটি ক্রেন আনা হয়েছিল। এর মধ্যে ৫০টন পর্যন্ত ভার তুলতে সক্ষম এমন হাইড্রোলিক ক্রেনও ছিল। ধ্বংসস্তূপ যাতে নতুন করে আর ধসে না পড়ে, তার জন্য ক্রেন দিয়ে কাঠামোটিকে ধরে রাখা হয়। উদ্ধারকারীরা প্রথমে পিছন দিকের মাটি কেটে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করলেও তাতে লাভ হয়নি। এরপর হাইড্রোলিক মই লাগিয়ে উপরে উঠে আটকে পড়াদের বের করার চেষ্টা হয়। কিন্তু ঢালাইয়ের মোটা স্তর আর লোহার বিম কাটতে গিয়ে রীতিমতো বেগ পেতে হয় তাঁদের।
শেষমেশ কিছু জায়গায় ফুটো করে ভিতরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। এতে আটকে থাকা মানুষদের অবস্থান বুঝতেও খানিকটা সুবিধা হয়। ওই ধ্বংসস্তূপে বাকিদের খোঁজে পুলিশ স্নিফার ডগ এবং ড্রোনও কাজে লাগানো হয়। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘ঘটনাস্থলে উচ্চ স্বাস্থ্য পরিষেবাযুক্ত প্রচুর অ্যাম্বুল্যান্স রয়েছে। অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্প গড়া হয়েছে। পুরো স্বাস্থ্যভবনটাই এ দিন এসএসকেএম হাসপাতালে ছিল।’ উদ্ধারকাজ যাতে রাতেও ব্যাহত না হয়, সে কারণে ঘটনাস্থলে বড় জেনারেটর এনে পর্যাপ্ত বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাত পর্যন্ত চলছে উদ্ধারকার্য।