অর্পিতা হাজরা
তারাতলার ভয়ানক বিপর্যয়ের নেপথ্যে গাফিলতি কার? প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে বুধবার বিকেল থেকেই। আর এই গাফিলতির প্রশ্নে ১০–১২ জনকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতিও শুরু করেছে কলকাতা পুলিশ। বুধবার রাতেই এই ঘটনায় জড়িত হিসেবে তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে কলকাতা পুলিশ জানিয়েছে।
ইতিমধ্যে এই ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। শুরু হয়েছে অভিযুক্তদের খোঁজ। গোডাউনের বিল্ডিং প্ল্যান–সহ অন্যান্য নথি সংগ্রহ করছে পুলিশ। নির্মাণকারী সংস্থার কর্তারা ছাড়াও পুলিশের নজরে রয়েছেন কলকাতা পুরসভার কিছু আধিকারিকও। তাঁদেরও ধাপে ধাপে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে লালবাজার।
পুলিশ ও বন্দর সূত্রে খবর, তারাতলা এলাকার ভেঙে পড়া গোডাউনটি কলকাতা বন্দরের জমিতে। সেখানে বহুতল গুদাম ও কোল্ড স্টোরেজের জন্য ভাগ ভাগ করে জমি লিজ় দেওয়া হয়। ২০২৪–এর ১ অগস্ট এই জমিটি ৩০ বছরের জন্য লিজ় দেওয়া হয় ‘বেহেরা ব্রাদার্স’ নামে ওডিশার একটি সংস্থাকে।
বন্দর সূত্রে খবর, জমির মোট পরিমাণ ৬৬৮৯ বর্গমিটার। তার একটি অংশে নির্মাণকাজ চলছিল। বুধবার দুপুরে সেখানেই দুর্ঘটনাটি ঘটে। ‘বেহেরা ব্রাদার্স’–এর মালিক শম্ভুনাথ বেহেরার খোঁজ করছে পুলিশ। তাঁর মোবাইল বন্ধ। তাঁর বাড়ি কলকাতায় থাকলেও, বর্তমানে ওডিশায় থাকতে পারেন বলে অনুমান গোয়েন্দাদের। এই ‘বেহেরা ব্রাদার্স’–এর ব্যবসা মূলত চায়ের। তারাতলায় তাদের এই গোডাউনটি নির্মাণের বরাত পেয়েছিল ‘অয়ন ট্রেডার্স’ নামে একটি সংস্থা।
কলকাতা পুলিশ সূত্রে খবর, এই দুর্ঘটনার নেপথ্যে গাফিলতি থাকতে পারে অনেকেরই। পুলিশের দাবি, যে সংস্থা জমি লিজ় নিয়েছে এবং সেখানে গোডাউন বানানোর জন্য যে সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, প্রাথমিকভাবে দায় বর্তায় তাদের উপরেই। যদি বিল্ডিং প্ল্যানে কোনও গাফিলতি থাকে তা হলে তার দায় চাপবে পুর আধিকারিকদের উপরেও। পুলিশের দাবি, এ ক্ষেত্রে কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের যে ইঞ্জিনিয়াররা ওই গোডাউনের নকশা অনুমোদন করেছিলেন, তাঁরাও দায় এড়াতে পারবেন না।
কলকাতা পুর এলাকায় যে কোনও নির্মাণের ক্ষেত্রে পুরসভার বিল্ডিং কমিটির অনুমোদন লাগে। এই কমিটিতে বিল্ডিং বিভাগের ডিজি ছাড়াও দমকল, কলকাতা পুলিশ, সিইএসসি, আর্কিটেক্টরা থাকেন। নিয়ম মেনে মিউনিসিপ্যাল বিল্ডিং কমিটি ওই গোডাউনের নকশা অনুমোদন করেছিল, নাকি কেউ বাইরে থেকে প্রভাব খাটিয়ে নকশা পাশ করিয়ে নিয়েছিলেন, তাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
তাঁদের দাবি, এ ধরনের নির্মাণ শুরুর আগে ‘সয়েল টেস্ট’ বা মাটির পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। এতে মাটির ভারবহন ক্ষমতা যাচাই করা হয়। সেই নিয়ম সঠিক ভাবে মানা হয়েছিল কিনা, পুরসভার তালিকাভুক্ত কোনও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারের তত্ত্বাবধানে সেই সয়েল টেস্ট হয়েছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এর পাশাপাশি গোডাউন তৈরির সময়ে যে সব নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার হয়েছে (লোহা, ইস্পাত, রড, সিমেন্ট, পাথর, বালি) তার গুণগত মানও পরীক্ষা করবে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, যদি মৃত বা আহতদের পরিবারের কেউ মামলা করেন, তা হলে তাদের করা সুয়োমোটো মামলায় তা যুক্ত করা হবে।