• যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রশ্নে কাঠামোও, অডিট কমিটির রিপোর্ট দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত
    এই সময় | ২৫ জুন ২০২৬
  • এই সময়: ঝড়বৃষ্টি বা অন্য কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বুধবার তারাতলায় গোডাউন ভেঙে পাঁচ জনের মৃত্যুর ঘটনার নেপথ্যে যান্ত্রিক ও পরিকাঠামোগত ত্রুটিই বড় কারণ বলে প্রাথমিক ভাবে পুলিশ–প্রশাসনের আধিকারিকদের দাবি। সেই সূত্র ধরেই এ দিন‍ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘মঙ্গলবারের ঝড়বৃষ্টির জন্য মাটি নরম হয়ে এই বিপর্যয় ঘটেনি। বরং ত্রুটিযুক্ত প্ল্যান এবং যান্ত্রিক ও কাঠামোগত খামতির কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।’

    কেন এবং কী ভাবে এই বিপর্যয়, তা নিয়ে আজ বিধানসভায় বিস্তারিত বিবৃতি দেবেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে তার আগেই এই ধরনের বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি এড়াতে বেনজির পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। এ দিন বিকেলে নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, ‘কলকাতা পুরনিগম এলাকায় আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত সমস্ত ধরনের নির্মাণকাজ আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।’

    শুভেন্দুর সংযোজন, ‘পূর্বতন সরকারের আমলে যে সমস্ত বড় নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, সেগুলি ফের নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে। মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে কলকাতা পুরসভা, পূর্ত দপ্তর, সিভিল ডিফেন্স, দমকল, পুলিশ এবং কেএমডিএ-র প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ অডিট টিম গঠন করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী কলকাতা পোর্ট এবং মেট্রো কর্তৃপক্ষের আধিকারিকদেরও এই কমিটিতে রাখা হবে।’

    মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, বিশেষ টিমের অডিটে সব ঠিক থাকলে আগামী ১ অগস্ট থেকে পুনরায় নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে। কলকাতার পরে আগামী দিনে বিধাননগর ও হাওড়াতেও এই একই অডিট প্রক্রিয়া চালানো হবে। তবে হাসপাতাল বা অন্যান্য জরুরি ক্ষেত্রে নির্মাণকাজে ছাড় থাকবে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আপাতত পূর্বতন সরকারের আমলে যে যে নির্মাণকাজের প্ল্যান পাশ করা হয়েছে, তা পুরোটাই খতিয়ে দেখবে ওই বিশেষজ্ঞ কমিটি। তিনি এও বলেন, ‘টাকা দিয়ে প্ল্যান পাশ হলে বা কাজ হলে এই ফলই তো হবে!’ তাই এই ধরনের প্রবণতা যেনতেন প্রকারে বন্ধ করতে তৎপর রাজ্য সরকার।

    স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, তারাতলার প্রায় ১,২২৬ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই গুদামটি বন্দর কর্তৃপক্ষের জমিতে অবস্থিত, যা একটি বেসরকারি সংস্থাকে ৩০ বছরের লিজ়ে দেওয়া হয়েছিল। গত দেড় বছর ধরে সেখানে লোহার কাঠামোর উপরে টিন ও অ্যালুমিনিয়ামের শিট চাপিয়ে তার উপরে কংক্রিটের স্তর চাপিয়ে নির্মাণের কাজ চলছিল। বুধবার বেলা সওয়া ১২টা নাগাদ হঠাৎই সেই ছাদটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। ভিতরে কোনও অভ্যন্তরীণ দেওয়াল বা কামরা না থাকায় পুরো ছাদ একসঙ্গে ধসে যায় এবং লোহার ভারী বিমগুলো প্রচণ্ড ভারে বিভিন্ন জায়গায় বেঁকে যায়। দুর্ঘটনায় বহু কর্মরত শ্রমিক ও গুদামের নির্মাণকারী সংস্থার ঠিকাদারও ভিতরে চাপা পড়ে যান। স্থান‍ীয়দের একাংশের দাবি, এ দিন সকালেই নাকি ছাদের অংশে সামান্য কাঁপুনি টের পেয়েছিলেন কেউ কেউ। ঠিকাদার সংস্থার কর্মীরা তার মধ্যেই কাজ করতে গেলে হঠাৎ ওই ছাদ ভেঙে পড়ে।

    এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে নির্মাণের মারাত্মক গলদ ও কাঠামোগত ত্রুটির কথাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক রিপোর্টেও নির্মাণের ত্রুটিকেই দায়ী করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এতবড় এলাকাজুড়ে নির্মাণ চালাতে হলে যত সংখ্যক বিম ও পিলার থাকার দরকার ছিল, তা দেওয়া হয়নি। এতবড় এলাকায় নির্মাণ চালাতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে কাজ হয়। এক্ষেত্রে সেটাও হচ্ছিল ন‍া।

    আবার সাধারণত নীচ থেকে ধাপে ধাপে উপরের দিকে নির্মাণ হলেও, এ ক্ষেত্রে প্রথমে সামান্য কিছু পিলার এবং বাকি লোহার বিম দিয়ে একবারে পাঁচ তলা খাড়া করা হয়েছিল। তারপরে নীচের ফ্লোরের পরিবর্তে উপর থেকে কংক্রিটের ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। সম্ভবত পর্যাপ্ত সংখ্যায় পিলার ও বিম না–থাকাতেই সেই ভার সামলানো যায়নি। যে অংশটি ভেঙে পড়েছে, সেখানে পিলারের উপরে অস্থায়ী ভাবে আলাদা করে টিন দিয়ে তার উপরে ঢালাই করা হয়েছিল।

    মঙ্গলবার রাতের ঝড়ে কিছু টিন উড়ে গেলে, বুধবার সকালে শ্রমিকরা তা পরীক্ষা ও মেরামত করতে যান। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, সকাল থেকেই কাঠামোটি নড়ছিল এবং তার মধ্যে কাজ চলাকালীনই পুরোটা ধসে পড়ে। সূত্রের খবর, গত দেড় বছরে এই নির্মাণ চলার সময়ে বেশ কয়েকবার বিম বসাতে গিয়ে মাটির চরিত্রও বদল হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। এ সব বিষয়ে নিশ্চিত হতে নির্মাণ বিশেষজ্ঞদেরও সাহায্য নেবে পুলিশ।

  • Link to this news (এই সময়)