যে দিন থেকে সংবাদমাধ্যমে মেয়ে অমৃতা সিংয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে, সে দিন থেকেই লাগাতার ফোন আসছে। কোনও কোনও দিন শতাধিক মানুষ ফোন করছেন। কিন্তু কেউই তাঁর মেয়ের খোঁজ দিতে পারছেন না। তাঁরা ফোন করছেন হয় মনোবল বাড়াতে, নয়তো সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য। এত দুশ্চিন্তা, রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মেয়েকে খোঁজার মধ্যে এত লোকের ফোন ধরতে ধরতে খানিক ক্লান্ত বাবা অর্ধেন্দু সিং। তবে এত লোক যে তাঁর মেয়ের জন্য চিন্তিত, তা দেখে সত্যিই ভালো লাগছে বীরভূমের সিউড়ির ওই বৃদ্ধের।
অর্ধেন্দু জানান, কলকাতা পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিকও তাঁকে ফোন করেছেন। সব রকম ভাবে তাঁর মেয়েকে খোঁজার চেষ্টা চলছে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। অমৃতার খোঁজে তদন্ত কত দূর এগোল, সে ব্যাপারে খোঁজ নিতে এই সময় অনলাইন যোগাযোগ করেছিল বীরভূমের পুলিশ সুপার ভিদিত রাজ বুন্দেশের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মার্চ মাসে নিখোঁজ হওয়া এই মেয়েটির জন্য মিসিং পার্সেন এন্ট্রি করা হয়েছিল। এর পর একটা এফআইআর রুজু করেছি। এ ছাড়াও বীরভূম জেলা পুলিশের একটা বিশেষ টিম তৈরি করা হয়েছে। তারা শুধুমাত্র ওই মেয়েটিকেই খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। সিআইডি এবং কলকাতা পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলির থেকেও সহযোগিতা নিচ্ছি। আমরা ১০০ শতাংশ চেষ্টা করছি, নিখোঁজ মেয়েটিকে খুঁজে বার করে তাঁকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে।’
পুলিশ সূত্রে খবর, তদন্তে নেমে সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছিল, অমৃতা সিউড়ি থেকে একটি বাসে উঠেছেন। কিন্তু তিনি কোথায় নেমেছেন, তা এখনও স্পষ্ট ভাবে জানা যায়নি। তরুণী যে বাসে উঠেছিলেন, সেই বাসের চালক এবং কন্ডাক্টরের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল। তাঁরা জানিয়েছেন, সেই দিন ওই বাসযাত্রায় যে ক’জন মহিলা ছিলেন, তাঁরা সকলেই মল্লারপুরে নেমে গিয়েছিলেন। তার পর আর বাসে কোনও মহিলা ছিল না। সেই কারণে মল্লারপুর আর তার আশপাশের এলাকা তো বটেই, গোটা বীরভূমেই অমৃতার নিখোঁজ-পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। তারাপীঠেও খোঁজখবর করা হচ্ছে।
পরিবার জানিয়েছিল, নিখোঁজ হওয়ার দিন ঘর থেকে বেরোনোর সময়ে নিজের কিছু নথি নিয়ে বেরিয়েছিলেন অমৃতা। সিউড়ি থানার তদন্তকারীদের সূত্র জানিয়েছে, সেই সব নথি দিয়ে তরুণী নতুন কোনও সিম কিনেছেন কি না, তা দেখা হয়েছিল। কিন্তু দেখা গিয়েছে, তরুণীর আধার নম্বরে নতুন কোনও সিম নথিভুক্ত হয়নি। এর মধ্যে ব্যাঙ্ক থেকেও কোনও টাকা তোলেননি অমৃতা। পুলিশ সূত্রে খবর, শুধু বীরভূম নয়, পড়শি জেলা মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়ার কিছু থানাতেও অমৃতার ছবি পাঠিয়ে খোঁজ করতে বলা হয়েছে। থানার এক পুলিশ আধিকারিকের কথায়, ‘নিজের মেয়ে হারিয়ে গেলে আমরা যে ভাবে খুঁজি, অমৃতা সিংকেও আমরা একই ভাবেই খোঁজাখুঁজি করছি। চেষ্টায় কোনও ত্রুটি রাখছি না। তরুণীকে উদ্ধার করে ওঁকে ওঁর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেবো।’
মাস তিনেক আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেননি বছর চব্বিশের অমৃতা। পুলিশ-প্রশাসন, এমনকী নেতাদের দরজায়ও কড়া নেড়েছেন অর্ধেন্দু। কিন্তু সুরাহা হয়নি। শেষে মেয়ের খোঁজে নিজেই রাস্তায় নেমেছেন বাবা। গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে প্রায় গোটা বীরভূমই ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। মেয়ের নাম-ছবি, শরীরের বর্ণনা সবই লেখা সেই প্ল্যাকার্ডে। সমাজমাধ্যমে সেই প্ল্যাকার্ডের ছবি দেখেই সম্প্রতি বিধাননগরের সল্টলেকে এক ভবঘুরে তরুণীকে দেখে অমৃতা বলে মনে হয়েছিল স্থানীয় কয়েক জনের। তাঁরা অর্ধেন্দুকে বিষয়টি জানানোর পরেই কলকাতায় গিয়েছিলেন বৃদ্ধ। কিন্তু পরে দেখা যায়, ওই ভবঘুরে অমৃতা নন। শেষে আবার চোখে জল নিয়েই সিউড়ি ফিরে এসেছিলেন বাবা।
তার পরেও অর্ধেন্দুর ফোনে একাধিক ফোন এসেছে। কিন্তু মেয়ের খোঁজ মেলেনি। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ, তার পরেও স্মিত হাসি হেসে বাবা বলছেন, ‘কখনও মুর্শিদাবাদ, কখনও শিলিগুড়ি, কখনও আবার দার্জিলিং, অসম ও দিল্লি থেকেও ফোন আসছে মেয়ের জন্য। সত্যি কথা বলতে, মেয়েকে খুঁজতে খুঁজতে যতটা না ক্লান্ত হয়েছি, তার চেয়েও বেশি ক্লান্ত হচ্ছি ফোনে কথা বলে। হয়তো মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীরও এত ফোন আসে না। তবে এটা সত্যিই ভালো লাগছে যে, আমার মেয়েটার জন্য সকলে এত চিন্তিত। আমার লড়াই চলতেই থাকবে। যত দিন না মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছি।’