সব্যসাচী ঘোষ, মালবাজার
বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বছর ২৪-এর যুবকটির প্রাণের সম্পর্ক। মালবাজার শহর লাগোয়া ক্ষুদিরাম পল্লির অয়ন সেনের জীবনের অনেকটার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন শুভেন্দু অধিকারী। তাই একটি বারের জন্য দেখা করে প্রণাম করতে চান নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে।
যোগাযোগের শুরুটা হয়েছিল ছ'বছর আগে। মালবাজার শহরের অভাবী মেধাবী ছেলে অয়ন আদর্শ বিদ্যাভবন থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন। উচ্চ মাধ্যমিকেও অয়নের কাছ থেকে ভালো ফলের আশা করছিলেন সবাই। কিন্তু, করোনা চলে আসায় স্বপ্ন ভেঙে যায়। অয়নের বাবা দীনেশ সেনের কাপড়ের ব্যবসা অতিমারীতে প্রায় লাটে উঠে যায়।
চরম দারিদ্রের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য দীনেশ আনাজের দোকান বসান ঘড়ি মোড়ে। সেখানে অয়নের দাদা নয়ন বাবাকে সাহায্য করতে শুরু করেন। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী অয়নকেও পড়াশোনাকে ছুটি দিতে হয়। তিনিও রোজগারের চেষ্টায় নেমে পড়েন। তাঁকেও দোকান করতে হয়। ঘড়ি মোড়ের বাজারে ডিমের দোকান বসান তিনি। ২০২০-র সেই খবর নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। সরকারি স্তর থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয় অয়নের দিকে, যাতে সে পড়াশোনা চালাতে পারে।
সেই সময়ে শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন পূর্বতন তৃণমূল সরকারের পরিবহণমন্ত্রী। অয়নের লড়াইয়ের খবর তাঁর কানে পৌঁছেছিল। অনেকেরই ধারণা, মালবাজারের তৎকালীন মহকুমাশাসক শান্তনু বালা ছিলেন যোগসূত্র। সেই শান্তনু এখন মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য আপ্ত সহায়ক। অয়নের লড়াইকে সমর্থন জানাতে শুভেন্দু আর্থিক সাহায্য পাঠিয়েছিলেন। আজও সেই ঘটনার কথা মনে করেন যুবকের মা রত্না সেন। বলেন, '১০ হাজার টাকা শুভেন্দু অধিকারী আমাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়েছিলেন। এতে আমাদের বিরাট উপকার হয়েছিল।' এতে অক্সিজেন পেয়েছিলেন অয়ন। বিজ্ঞান বিভাগে ভালো নম্বর পেয়ে পাশ করেছিলেন।
তবে যোগাযোগের এখানেই শেষ নয়। অয়ন পড়াশোনার পাশাপাশি ছবি আঁকাতেও খুব দক্ষ। ২০২৪-এ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রচারে মালবাজারে এসেছিলেন শুভেন্দু। সেই সময়ে বিজেপির মালবাজার বিধানসভার নেতা ও শিক্ষক রাকেশ নন্দীর অনুরোধে শুভেন্দুর ছবি এঁকে দিয়েছিলেন অয়ন। এই খবর জেনে তৃণমূল নেতাদের অনেকেই অয়নকে সোশ্যাল মিডিয়ায় আক্রমণ করেন। বিজেপির 'দালাল' বলেও চিহ্নিত করা হয় তাঁকে।
সে সব এখন অতীত। শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী হতেই বহু দিনের লড়াই যেন অনেকটা পূর্ণতা পেল অয়নের। অপমানের জ্বালাও এ বার জুড়োবে বলেই তিনি মনে করছেন। অয়ন বলেন, 'আমি কোনও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই। শুভেন্দু অধিকারীকে শ্রদ্ধা করি। ওঁর ছবি এঁকেছি বলে আমাকে নানা ভাবে অপমান করা হয়েছিল। তাই বোধহয় ধর্মের কল বাতাসে নড়েছে।'
গণিত নিয়ে সাম্মানিক স্নাতক ডিগ্রি লাভের পরে অয়ন এখন একটি বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। দাদা নয়ন একটি গ্যারাজে বাইক-স্কুটি মেরামতির কাজ করেন। বিএড প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন। আরও উন্নতি করা লক্ষ্য তাঁর। আগামীতে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রহর গুনছেন তিনি। বলেন, 'যাঁর ছবি আঁকার জন্য আমাকে অনেকের সঙ্গে মানসিক যুদ্ধ চালাতে হয়েছে, তাঁর মুখ্যমন্ত্রী হওয়া আসলে আমারই জীবনের সার্থকতা। মুখ্যমন্ত্রীকে যেন এক বার প্রণাম করতে পারি, সেই অপেক্ষায় আছি।'