বাংলায় এবার অভিন্ন দেওয়ানি বিধি: অমিত শাহ কথা দিয়েছিলেন, নতুন সরকার বিধানসভায় আনছে বিল
দৈনিক স্টেটসম্যান | ২৬ জুন ২০২৬
তারিখটা ছিল ১০ এপ্রিল, ২০২৬। কলকাতায় বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহার বা ‘সংকল্প পত্র’ প্রকাশ করতে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। সেখানে তিনি একটি কথা বলেছিলেন, যা সে দিন অনেকে হয়তো হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছিলেন। বললেন, বাংলায় বিজেপি সরকার তৈরির ছয় মাসের মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (Uniform Civil Code) কার্যকর হবে।
তিন মাসও পেরোয়নি। সেই কথা বাস্তবের দরজায় কড়া নাড়ছে।
৯ মে, ২০২৬। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। আর এখন খবর, তাঁর সরকার UCC বিল বিধানসভায় পেশ করতে চলেছে।
সহজ করে বললে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) মানে হল দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার এবং দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে একই আইন। ধর্ম নির্বিশেষে।
এখন দেশে যে ব্যবস্থা আছে, সেটা আলাদা। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান– প্রত্যেক ধর্মের নিজস্ব পার্সোনাল ল (Personal Law) আছে। বিবাহ ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সেই আলাদা আলাদা আইনই চলে। UCC এলে সবার জন্য এক আইন।
উত্তরাখণ্ডে এই আইন আগেই কার্যকর হয়েছে। গুজরাতেও। সবশেষ আসামের বিধানসভায় UCC বিল পেশ হয়েছে মে মাসে। এ বার পালা পশ্চিমবঙ্গের।
UCC-র অন্যতম বড় বিষয় হল লিভ-ইন সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ। এখন যেমন ইচ্ছেমতো লিভ-ইনে থাকা যায়, UCC এলে সেই সম্পর্ক বাধ্যতামূলক ভাবে নিবন্ধন করতে হবে। না করলে শাস্তি।
উত্তরাধিকারের প্রশ্নেও বড় বদল আসবে। কেউ উইল না করে মারা গেলে সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হবে, সেটা নির্ধারিত হবে একটিই অভিন্ন নিয়মে। স্ত্রী বা স্বামী, সন্তান, বাবা-মা… সবাই সমান অগ্রাধিকার পাবেন।
বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হবে। বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।
বিজেপির যুক্তি স্পষ্ট, এই আইন মুসলিম মহিলাদের জন্য বিশেষভাবে দরকারি। তিন তালাক বা বহুবিবাহের মতো প্রথা থেকে রক্ষা পাবেন তাঁরা।
শাহ সেদিন সংকল্প পত্রে শুধু UCC-ই ঘোষণা করেননি। বলেছিলেন, মহিলাদের জন্য মাসে ৩,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা, গরুপাচার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ, ১০০ দিনের মধ্যে শিল্পনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত।
UCC প্রতিশ্রুতিটা তালিকায় ছিল একেবারে উপরের দিকে।
এই আইন নিয়ে বিতর্ক বিস্তর। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, তফসিলি উপজাতিদের (Scheduled Tribes) এই আইনের বাইরে রাখলে তা আর কতটা ‘অভিন্ন’ থাকে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। লিভ-ইন সম্পর্কে পুলিশি হস্তক্ষেপের বিধান নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা খর্ব করে কিনা, তা নিয়েও আপত্তি আছে।
তৃণমূল কংগ্রেস আগে থেকেই UCC-র বিরোধী। কংগ্রেস ও বাম দলগুলোরও আপত্তি একই জায়গায়। প্রশ্ন, কেন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত আইনে হস্তক্ষেপ করা হবে!
শপথগ্রহণ হয়েছে ৯ মে। ছয় মাসের ডেডলাইন পড়ছে নভেম্বরের শুরুতে। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার কিন্তু সেই সময় আসার আগেই বিধানসভায় বিলটি তুলতে চাইছে বলে খবর।
এটা নিছক আইনি পদক্ষেপ নয়। এটা একটা রাজনৈতিক বার্তাও। যে সরকার প্রতিশ্রুতি রাখে।
আসামে UCC বিল পেশের পর মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma) বলেছিলেন, ‘বিরোধীরা আমাদের থামাতে ব্যর্থ হলে প্রথম বিধানসভা অধিবেশনেই UCC আনব। সেই মতোই তিনি বিল পেশের পর দাবি করেছেন, কথা দিয়েছিলাম, রেখেছি।
শুভেন্দু অধিকারীও একই ভাষায় কথা বলছেন। বাংলায়ও UCC-র হাত ধরে এবার অভিন্ন যাপনের সেই অধ্যায়ের শুরু প্রায় নিশ্চিত।