• অবশেষে খুলতে চলেছে বরুণ বিশ্বাস হত্যা রহস্য
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ২৬ জুন ২০২৬
  • বরুণ বিশ্বাস হত্যার ১৪ বছর বাদে একে একে খুলছে মাটি অবধি পৌঁছে যাওয়া ষড়যন্ত্রের শিকড়। বরুণ হত্যার পরে কীভাবে তাঁর নাম করে লক্ষ লক্ষ টাকা তোলা হয়েছিল বা কীভাবে সুটিয়ায় বরুণের আবক্ষ মূর্তি বসানো নিয়ে তৈরি হয়েছিল রাজনৈতিক স্বার্থ কায়েমের খেলা, তা আজ প্রকাশ করলেন বরুণ বিশ্বাসের দাদা অসিত বিশ্বাস।

    আজও সঠিক বিচারের আশায় চোখে জল নিয়ে শেষদিন গুনছেন বরুণের বাবা জগদীশচন্দ্র বিশ্বাস। তাঁর দাবি, মৃত্যুর আগে যেন দোষীদের শাস্তি দেখে যেতে পারেন তিনি।

    অসিত বিশ্বাস, এদিন দৈনিক স্টেটসম্যানকে জানান, গত ১৩ জুন বনগাঁ থানায় বরুণের মৃত্যুর পুণর্তদন্তের আবেদন করা হয়েছে পরিবারের তরফ থেকে। বনগাঁ জিআরপির ওসি ও বনগাঁ পুলিশ জেলার এসপি কেও ওই চিঠি দেওয়া হয়েছে।  ওই ঘটনায় যারা আসল অভিযুক্ত তাঁদের কবে গ্রেপ্তার করা হবে তা জানতে চেয়েও করা হয়েছে আবেদন। চোখের জল মুছে তিনি জানান, বরুণের মৃত্যুর পরে, ‘বরুণ স্মৃতি রক্ষা কমিটি তৈরি হয়েছিল। সেই কমিটির নামে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে একটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। ওই অ্যাকাউন্টে বরুণের নাম ভাঙিয়ে অন্তত ১৫-২০  লক্ষ টাকা তুলে জমা করা হয়েছিল গোবরডাঙার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে জমা করা হয়েছিল। যার কোন হিসেব নেই। বরুণ খুনে যার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ সেই রাজ্যের প্রাক্তন খাদ্য ও বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের টিকিও ছুঁতে পারেনি পুলিশ। বরুণকে নিয়ে ব্যবসা করেছে ওই কমিটি।’ অভিযোগ অসিত বিশ্বাসের।

    অন্যদিকে প্রতিবাদী শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসের মৃত্যুর পরে সুটিয়ায় তাঁর একটি আবক্ষ মূর্তি বসানো হয়েছিল। যা ইচ্ছে করে বিকৃত করেই তৈরি করা হয়েছিল। জনৈক ননীগোপাল পোদ্দার  প্রাক্তন মন্ত্রীর সঙ্গে যোগসাজশ করে ওই মূর্তি সুটিয়ায় বরুণের এলাকায় বসান। ‘ মূর্তি বসানোর আগে মূর্তির মুখ সার্টিফাই করাতে হয় পরিবারের লোকের কাছ থেকে। যা করা হয়নি। উল্টে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের সঙ্গেই ষড়যন্ত্র করে বিকৃত মূর্তি বসানো হয়েছে।’ অভিযোগ অসিত বিশ্বাসের। বরুণের পরিবারের আশা, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সঠিক বিচার পাইয়ে দিতে পারবেন বরুণকে।

    ২০১২ সালের ৫ জুলাই গোবরডাঙা রেলস্টেশনে টিকিট কাউন্টারের কাছে দুষ্কৃতীদের গুলিতে প্রাণ দিতে হয়েছিল বরুণকে। অভিযোগ, এমনকি রক্তাক্ত বরুণকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতেও বাধা দেন স্থানীয় তৃণমূল নেতা কর্মীদের একাংশ। বরুণকে দেখতে জড়ো হওয়া স্থানীয়দের রীতিমত ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে। সেই সময়ে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল বরুণের দেহ।  রক্ত বন্ধ করার জন্য বরুণ নিজের জামা খুলে নিজের ক্ষতস্থানে বেঁধে দেয়। কিন্তু ষড়যন্ত্রীরা ওই জামাটি খুলে ফেলে দেয়। ফলে শুরু হয়েছিল অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ।  ওই অবস্থাতেই বরুণকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। প্রথমে গোবরডাঙা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও তারপরে সেখান  থেকে বারাসত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে অবস্থার অবনতি হয়েছিল। সেখান থেকে ফের ঘুরিয়ে বরুণকে হাবড়া হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু পথেই তাঁর মৃত্যু হয়।  তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেসের ছায়ায় থাকা দুষ্কৃতীদের অন্যায়, অপরাধের বিরুদ্ধে একমাত্র স্বর ছিলেন বরুণ বিশ্বাস। আর সেই কারণেই সেই স্বরকে বন্ধ করে দেওয়া আরও বেশি করে প্রয়োজন ছিল তৃণমূলের।

    ‘হাবড়া হাসপাতালেই তৎকালীন বনগাঁ জিআরপির ওসি উপস্থিত ছিলেন। তিনি সেদিন অভিযোগপত্র সই করিয়ে নেন আমাকে দিয়ে। তিনি আরও জানান, অভিযোগপত্রে প্রকৃত ষড়যন্ত্রী ও অপরাধীদের নাম দিতেও রাজি হয়নি পুলিশ।

    পরবর্তীতে জানা যায়, সেদিন ঘটনার সময়ে যারা গোবরডাঙা স্টেশনে উপস্থিত ছিলেন তাঁরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। পরে পুলিশের কাছে অভিযুক্তদের নাম বলার চেষ্টা করলে পুলিশ তা কোনোভাবেই নথিভুক্ত করেনি বলে অভিযোগ। যখনই ষড়যন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কথা বলার চেষ্টা হয়েছে তখনই বিশ্বাস পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে দুষ্কৃতীরা বলে অভিযোগ করেন অসিত বিশ্বাস। এমনকি বরুণবাবুর বাবার সাক্ষীও নেননি তদন্তকারী অফিসারেরা বলে অভিযোগ তাঁর।

    আজও গোবরডাঙা স্টেশনের রক্তাক্ত সেই দৃশ্য মনে করে ছেলের ছবির দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলেন  নব্বয়োর্দ্ধ জগদীশ চন্দ্র বিশ্বাস। অভিযোগ, তাঁর জীবদ্দশায় আদৌও কি প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিজের চোখে দেখে যেতে পারবেন তিনি? কখনও ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে আজও যেন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে স্কুল থেকে ফেরার সময় হলেই সদর দরজা খুলতে যান অশীতিপর এই বৃদ্ধ। এই বুঝি বরুণ এল।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)