• তারাতলায় কাজে গিয়ে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন শেষ কাটোয়ার রোহিত চৌধুরীর
    বর্তমান | ২৬ জুন ২০২৬
  • অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: বাবা পক্ষাঘাতগ্রস্ত। বাড়িয়ে শয্যাশায়ী। মা সবজি বিক্রি করেন। বছর কুড়ির ছেলেটার লক্ষ্য ছিল কাজ শিখে বিদেশে যাবেন। সেই কাজ শিখতে কাটোয়ার গাজীপুর থেকে কলকাতার তারাতলায় গিয়েছিলেন রোহিত চৌধুরী। দু’চোখ ভরা স্বপ্ন—অভাবের সংসারের হাল ধরবেন, বাবাকে ভালো ডাক্তার দেখাবেন, মায়ের কষ্ট লাঘব করবেন। রোহিতের সব স্বপ্ন চাপা পড়ে গেল তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামের ধ্বংসস্তূপে! মঙ্গলবার বিকালেই মা’কে ফোন করে রোহিত বলেছিলেন, ‘মা, চিন্তা কোরো না, আমি ঠিক আছি। ৫ জুলাই কাকার বিয়েতে বরযাত্রী  যাবো।’ পরের দিনই সব শেষ! বৃহস্পতিবার গাজীপুরের চৌধুরীপাড়ার বাড়িতে আসে রোহিতের নিথর দেহ। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন মা নিলমদেবী ও বাবা বেনারসি চৌধুরী। ছেলের দেহের উপর আছড়ে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন দু’জনেই। বাড়িতে পড়শিদের ভিড়। সমস্বরে সবার দাবি, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক। যাঁদের গাফিলতিতে এতগুলি তরতাজা প্রাণের মৃত্যু হল, তাঁদের কড়া শাস্তি চাই। বেনারসি ও নিলমদেবীর দুই ছেলে। রোহিত বড়। রোহন ছোটো। সে অগ্রদ্বীপ স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। রোহিত ২০২৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। ঠিক করেন আইটিআই নিয়ে পড়াশুনা করে বিদেশে চাকরি করবেন। তার আগে হাতেকলমে কাজ শিখতে গিয়েছিলেন তারাতলায়। আর সেটাই তাঁর কাল হল। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা পেশায় ঠিকাদার সুভাষ চৌধুরী রোহিতের মামা। ছ’মাস আগে মামার সঙ্গেই তারাতলায় কাজে গিয়েছিলেন রোহিত। বুধবার রাতে মামাই রোহিতের বাড়িতে ফোন করে ভাগ্নের মৃত্যু সংবাদ দেন। নিলমদেবী এদিন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ছেলেটার প্রাণটা এভাবে চলে যাবে, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি! আমাদের অভাবের সংসার। ও আলো জ্বালাতে চেয়েছিল। পারল না।’ রোহিতের মাসতুতো দিদি নেহা চৌধুরী বলেন, ‘রোহিত গত মে মাসে বাড়ি এসেছিল। আমাদের বাড়িও গিয়েছিল। আসলে ভাই আইটিআইতে ফিটার ট্রেড নিয়ে পড়াশোনা করতে চেয়েছিল। কিন্তু অর্থাভাবে উচ্চমাধ্যমিকের পর পড়াশোনা বন্ধ করতে হয়েছিল। ভাই চেয়েছিল এখন কাজ করে কিছু টাকা আয় হবে। তারপরে আবার পড়াশোনা করবে। স্বপ্ন দেখত, বিদেশে গিয়ে মোটা টাকার বেতনে চাকরি করবে। ওর সব স্বপ্ন শেষ!’রোহিতের সঙ্গেই তারাতলায় কাজে গিয়েছিলেন পড়শি যুবক রামপ্রসাদ চৌধুরী (২২)। তিনিও শেডের নীচে চাপা পড়ে গুরুতর জখম হন। তাঁর কোমর ভেঙে গিয়েছে। চোট পেয়েছেন মাথায়। ডান পা ক্ষতবিক্ষত। চিকিৎসা চলছে এসএসকেএম হাসপাতালে। রামপ্রসাদ দেড় মাস হল কাজে গিয়েছিলেন। আগে তিনি জয়পুরে সোনার কাজ শিখতে গিয়েছিলেন৷ তাঁর বাবা মোহরলাল চৌধুরী আগেই মারা গিয়েছেন। দুই দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। পরিবারের মূল রোজেগেরে ছিলেন রামপ্রসাদই। এদিন তাঁর মা যামিনী চৌধুরী বলেন,‘মনে হচ্ছে ছেলেটা সারাজীবনের মতো পঙ্গু হয়ে যাবে। সংসারে অভাব ঘোচাতে এসে এভাবে মূল্য চোকাতে হবে ভাবিনি।’ 

     কাটোয়ার গাজিপুরের রোহিত চৌধুরীর শোকার্ত মা।
  • Link to this news (বর্তমান)