তারাতলার বিপর্যয়ে সিট গঠন, কঠোর অবস্থান মুখ্যমন্ত্রীর, নিথর ১১ দেহ, মৃত্যু ১৮ ছোঁয়ার আশঙ্কা!
বর্তমান | ২৬ জুন ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: নিশ্চিত মৃত্যু, আর জীবনের মধ্যে একপলকের ফারাক। তারাতলা বিপর্যয়ে সেই ফারাকটাই রাতদিন এক করে মিটিয়ে উদ্ধারকারী কর্মী-আধিকারিকরা। লক্ষ্য একটাই—তিনতলা গোডাউনের ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা প্রত্যেকটি প্রাণ যেন বাঁচে। উন্নত প্রযুক্তি এবং অটুট মনোবল সঙ্গী করে লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন তাঁরা। ৩২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে। অক্লান্ত, অবিরাম! যদিও তাতে মৃত্যুমিছিল থামছে না। বুধবার দুপুরে বিপর্যয়ের পর ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে লালবাজার। ১৯ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও সূত্রের খবর, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ ছুঁতে পারে। কারণ, চারজন আশঙ্কাজনক। এবং এনডিআরএফ সূত্রে খবর, এখনও ৩ শ্রমিক ধ্বংসস্তূপে আটকে রয়েছেন। তাঁদের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। আশঙ্কা করা হচ্ছে, তাঁরা বেঁচে নেই। এই শ্রমিকদের উদ্ধারের জন্য এদিন দুপুরে ‘বম্ব ড্রিলিং’-এর ব্যবস্থা হয়। কিন্তু বাধ সাধে আকাশ। বজ্রপাতের সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি ও ঝোড়া হাওয়ায় উদ্ধারকাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় পুলিশ, দমকল, পুরসভা, সেনা ও এনডিআরএফের যৌথ টিম। জলমগ্ন হয়ে যায় অকুস্থল। নিষ্কাশনে যায় পুরসভার জেট কাম সাকশন মেশিন।
এরইমধ্যে অবশ্য তারাতলার বিপর্যয় রাজনৈতিক রং নিয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ এবং সেই সংক্রান্ত বিল্ডিং প্ল্যানকে অনুমোদন দেওয়ার জন্য বৃহস্পতিবার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে দায়ী করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিধানসভায় ফিরহাদের স্বাক্ষরিত একটি কাগজ দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এটা আপনারা কী করেছেন? বিষয়টা ছাড়ার কোনো সিন নেই। এতে প্রাক্তন মেয়রের সই আছে। সিটি অব জয় ও বৃহত্তর কলকাতাকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছেন আপনারা।’ একইসঙ্গে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা পুরসভার এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার রঞ্জন দাস, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার নির্মলেন্দু সরকার এবং সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আমিরুল শেখের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপের কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিগত সরকারের আমলে বিপর্যয়ে সেনার সহযোগিতা না নেওয়া এবং বিধানসভা অধিবেশন চলাকালীন তার বাইরে ক্ষতিপূরণসহ অন্যান্য ঘোষণার বিষয়েও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি শুভেন্দু। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফিরহাদ। তাঁর বক্তব্য, প্ল্যানে গলদ ছিল না। কিন্তু নির্মাণের সময় যদি দুর্নীতি বা গাফিলতি হয়, তার দায় আমার কীভাবে হয়?
লালবাজার এদিন জানিয়েছে, তারাতলা বিপর্যয়ের নেপথ্যে কার দায়, কার গাফিলতি—এনিয়ে ‘ময়নাতদন্ত’ করার জন্য গঠন করা হয়েছে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (সিট)। তার নেতৃত্ব দিচ্ছেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধদমন) কুণাল আগরওয়াল। সেই দলে রয়েছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার জয়সূর্য মুখোপাধ্যায়, হোমিসাইড শাখার ওসি দেবাশিস দত্ত, ঘটনার তদন্তকারী অফিসার ইনস্পেক্টর হীরক দলপতি সহ মোট ৬ জন। এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঘটনায় অভিযুক্ত করে গোডাউন মালিক শম্ভুনাথ বেহেরা সহ মোট ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে একাধিক জায়গায় গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে সিট। জমি লিজ নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং নির্মাণে গাফিলতির ইঙ্গিতও মিলেছে। এনিয়ে কলকাতা পুরসভার কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছে সিট। এই সমস্ত বিষয়ের উপর ভিত্তি করে মামলার গতিপ্রকৃতি ঠিক করছে লালবাজার। সবকটি বিষয়ে খতিয়ে দেখে এদিন লোহার বিম প্রস্তুতকারক কোম্পানির মালিক কমল সামন্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তকারীরা জেনেছেন, কেএমসিতে নির্মাণের প্ল্যান মঞ্জুর করার জন্য এক দালালকে ঠিক করা হয়েছিল। সেই আব্দুল হামিদকেও গ্রেপ্তার করেছে সিট। এদিন আলিপুর আদালতে ধৃতদের পেশ করা হয়। সরকারি আইনজীবী সৌরিন ঘোষাল বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে কারা লাইসেন্স দিল, কারা নিম্নমানের মাল সরবরাহ করল, সবটা তদন্ত করে দেখতে হবে। আর যারা জড়িত, খুঁজে বের করা হবে তাদেরও।’ বিচারক ধৃতদের ৪ জুলাই পর্যন্ত পুলিশ হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।