• আর ফিরবেন না নবীন, বাড়িতে রেল ধরিয়েছে উচ্ছেদের নোটিস
    এই সময় | ২৬ জুন ২০২৬
  • বিশ্বদেব ভট্টাচার্য, আসানসোল

    বুকের ভিতরে একরাশ উৎকণ্ঠা চেপে গলায় মা–বাবার একটা ছবি ঝুলিয়ে অপেক্ষা করছে দশ বছরের খুদে আরিয়ান। পাশে বসে ছলছল চোখে দিন গুনছে তার ১৪ বছরের দিদি কোমল কুমারী। বিহার থেকে ছুটে আসা দাদু জহর সিং দু’জনকে বুকে টেনে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর নিজের চোখেই জল। প্রতিবেশী একজন দুপুরে খাবার দিয়ে গেলেও তা ছোঁয়নি দুই ভাইবোন। ওরা এখনও জানে না, ওদের বাবা আর কোনও দিন জীবন্ত অবস্থায় ফিরবেন না।

    কলকাতার তারাতলায় নির্মীয়মাণ গোডাউন ভেঙে পড়ার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ওই দুই ভাইবোনের বাবা আসানসোলের রানিগঞ্জের লায়েকবাঁধ তিন নম্বর ধাওড়ার বাসিন্দা বছর ৪৪–এর নবীন সিং। হাতের ‘নবীন’ লেখা ট্যাটু দেখে শনাক্ত করা হয় তাঁকে। ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে ‘ব্রট ডেড’ বা মৃত বলে ঘোষণা করেছেন।

    কিশোর বয়স থেকেই বিল্ডারের অধীনে শ্রমিকের কাজ করতেন নবীন। দিন ১৫ আগে বাড়িতে এসে ঘুরেও গিয়েছেন। তাঁর তিন ছেলেমেয়ের পড়াশোনা আর সংসারের খরচ টানতেই তিনি কলকাতায় এক ঠিকাদারের অধীনে তারাতলার কাজে যোগ দেন। নবীনের অষ্টম শ্রেণিতে পড়া মেজো মেয়ে কোমল কুমারী জানায়, বুধবার দুপুর একটা নাগাদ ঠিকাদারি সংস্থার কাছ থেকে শুধু খবর আসে যে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। তার বেশি কিছু জানানো হয়নি।

    সেই খবর পেয়েই নবীনের স্ত্রী নেহা দেবী বুধবার দুপুর ২টো ২০ নাগাদ ট্রেনে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেন দশম শ্রেণির পড়ুয়া বড় ছেলে প্রিন্স কুমারকে নিয়ে। কলকাতায় পৌঁছে নবীনের ডান হাতে ‘নবীন’ লেখা ট্যাটু দেখে তাঁরা দেহ শনাক্ত করেন।

    কোমল আরও বলে, ‘বুধবার সকাল ১০টা নাগাদ বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। বাড়ি থেকে ফোন করা হলে বাবা বলেছিল— এখন কাজ করছি, পরে কথা বলব। তার পর থেকেই বাবার ফোন সুইচ অফ পাই।’

    পরিবারটি যখন তাদের একমাত্র উপার্জনকারী অভিভাবককে হারিয়ে অথৈ জলে, ঠিক তখনই তাদের মাথার উপর থেকে ছাদটুকুও কেড়ে নেওয়ার খাঁড়া ঝুলছে। নবীনরা যে জায়গায় থাকেন, সেটি রেল এলাকার বার্ন কোম্পানির জমি। ইতিমধ্যেই রেল কর্তৃপক্ষ নোটিস জারি করে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সবাইকে বাড়ি ছাড়তে হবে, অন্যথায় উচ্ছেদ করা হবে। এই উচ্ছেদের প্রতিবাদে এ দিন সরব হয়ে বিক্ষোভ দেখায় সিটু।

    অন্য দিকে, নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক পার্থ ঘোষ এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি ইতিমধ্যেই পূর্ব রেলের জিএমের সঙ্গে কথা বলে রানিগঞ্জ এবং অন্ডালের যে তিনটি জায়গায় উচ্ছেদের কথা বলা হয়েছে, তা যেন না–করা হয়, সেই অনুরোধ জানিয়েছি।’

    এক দিকে বাবার মৃত্যু আর অন্য দিকে ভিটেমাটি হারানোর চরম অনিশ্চয়তা— এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে রানিগঞ্জের লায়েকবাঁধ এলাকা। এখন কী ভাবে এই অসহায় পরিবারটি চলবে, তার উত্তর অজানা।

  • Link to this news (এই সময়)