সোমনাথ মাইতি, দিঘা
ঝাউয়ের অবগুণ্ঠনে ঢাকা সৈকত কি ফিরে পেতে চলেছে দিঘা? জেলা বন দপ্তরের উদ্যোগে তেমন সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে। রাজ্যের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র দিঘার সৌন্দর্যায়নে এ বার হারিয়ে যেতে বসা ঝাউবন ও ম্যানগ্রোভ ফিরিয়ে আনার চিন্তা-ভাবনা করছে প্রশাসন। ইতিমধ্যে দিঘা উপকূলে ম্যানগ্রোভ লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় জমি খোঁজার কাজও শুরু করেছে বন দপ্তর।
বছর কুড়ি আগেও দিঘা, তাজপুর, মন্দারমণি বলতে পর্যটকদের চোখে ভেসে উঠত সমুদ্র, সোনালি বালির সৈকত আর ঝাউয়ের জঙ্গল। কিন্তু গত ১০-১৫ বছরে দিঘার সেই রূপ অনেকটাই বদলে গিয়েছে বলে অভিযোগ পরিবেশ কর্মী থেকে পর্যটকদের। যে সৌন্দর্যের জন্য দিঘার খ্যাতি ছিল, সৈকত এলাকায় সেই ঝাউবন এখন প্রায় অদৃশ্য।
বদলে ভাঙাচোরা সৈকতে জায়গা করে নিয়েছে মার্বেল, টাইলস, পাথর বসানো ঝাঁ চকচকে গার্ডওয়াল আর হোটেল, পার্ক, দোকনঘর। যে কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একদা ঘন ঝাউয়ের জঙ্গল। বন দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ঝাউবন ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছে তারা। শুধু দিঘা নয়, সৈকত জুড়ে ঝাউ, কেয়া, সমুদ্র কলমির মতো উপকূলের স্বাভাবিক উদ্ভিদ ফিরিয়ে আনার জন্য নতুন করে গাছ লাগানোর কাজ শুরু করেছে বন দপ্তর।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় বনভূমির পরিমাণ ১৭০০ একরের কিছু বেশি। এর মধ্যে দিঘায় বন দপ্তরের জায়গা মাত্র ৩০০ একর। বাকি জায়গা দিঘা শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদের। ইতিমধ্যে বন দপ্তর এই জায়গায় থাকা পুরনো গাছের পাশাপাশি নতুন ঝাউ গাছ লাগাতে উদ্যোগী হয়েছে। পাশাপাশি দিঘা, জুনপুট, খেজুরি এলাকায় ম্যানগ্রোভ লাগানোর কাজও শুরু করেছে তারা।
তবে দিঘা থেকে খেজুরি পর্যন্ত উপকূল এলাকায় বন দপ্তরের জমির পরিমাণ খুব কম হওয়ায় তারা প্রয়োজনীয় জমির খোঁজ শুরু করেছে ম্যানগ্রোভ বলয় গড়ে তোলার জন্য। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে রাজ্য বন দপ্তরের সচিব মনীশ জৈন সম্প্রতি সরেজমিন উপকূল এলাকা পরিদর্শন করেছেন বলে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে বগুড়ান জলপাই এলাকায় কেয়ার মতো ম্যানগ্রোভলাগিয়ে ভূমিক্ষয় রোধে সাফল্য এসেছে বলে বন দপ্তরের দাবি। তাদের দাবি শুধু বগুড়ান জলপাই নয়, ম্যানগ্রোভ বনসৃজনে সাফল্য এসেছে কানাইচট্টা, জুনপুট, খেজুরির সমুদ্র সংলগ্ন এলাকাতেও।
পরিবেশ কর্মী সোমনাথ দাস অধিকারী বলেন, 'দিঘার আসল সৌন্দর্য তার স্বাভাবিক পরিবেশ। দিঘায় ঝাউবন হারিয়ে যাওয়ার পথে। তা হলে শহরের কংক্রিটের জঙ্গল থেকে এক দণ্ড স্বস্তি পেতে আর একটা কংক্রিটের জঙ্গলে মানুষজন বেড়াতে আসবেন কেন। বন দপ্তর যদি নতুন করে ঝাউ গাছ লাগাতে উদ্যোগী হয়, তাহলে খুব ভালো।' আর এক পরিবেশ কর্মী ও শিক্ষক প্রীতিরঞ্জন মাইতি বলেন, 'দিঘার উপকূলে বন দপ্তরের জায়গা খুব কম।
কিন্তু সেচ দপ্তর, উন্নয়ন পর্ষদের অনেক জাগয়া রয়েছে। যেখানে ঝাউ, কেয়ার মতো গাছ লাগানো সম্ভব। দিঘার কাছে ঘেরসাই মৌজায় ম্যানগ্রোভের বনাঞ্চল তৈরির জন্য চারা রোপণ করা হলেও নজরদারির অভাবে তা গোরু-ছাগলের বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একই ভাবে রামনগরের ছয় ফুকার এলাকায় সেচ দপ্তরের জায়গায় ম্যানগ্রোভ ও ঝাউ গাছ লাগানো যেতে পারে।' তিনি জানান, উপকূল এলাকা জুড়ে ম্যানগ্রোভ ও ঝাউয়ের বলয় গড়ে তুলতে পারলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি ভাঙন ও ভূমিক্ষয় প্রতিরোধ করাও সম্ভব হবে।