• ধৃতের লিস্টে দাগি, নির্মাণে খারাপ সামগ্রী
    এই সময় | ২৬ জুন ২০২৬
  • এই সময়: তারাতলা–বিপর্যয়ের ঘটনায় স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ও সুপারভাইজ়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বুধবার রাতেই। বৃহস্পতিবার পুলিশের জালে ধরা পড়লেন তারাতলার ওই গোডাউনের জমির লিজ়–প্রাপক মূল সংস্থা ‘বেহরা ব্রাদার্সে’র মালিক শম্ভুনাথ বেহরা সমেত আরও তিন জন। ফলে এই ঘটনায় গ্রেপ্তারির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল পাঁচ।

    তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই বিপর্যয়ের ঘটনায় যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অতীতেও এক বা একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছেন। কারও নামে তোলাবাজি, কারও বিরুদ্ধে অপহরণ বা মারধরের মামলাও রয়েছে বলে দাবি পুলিশের। পুরোনো কয়েকটি মামলায় চার্জশিটও জমা পড়েছে। পুলিশের দাবি, অভিযুক্তদের চরম গাফিলতির কারণেই এতবড় বিপর্যয় ঘটেছে এবং প্রাণ গিয়েছে অন্তত ১১ জনের। কতটা গাফিলতি, তার প্রাথমিক নমুনা হিসেবে একটা তথ্যই যথেষ্ট। সেটা হলো— ওই নির্মীয়মাণ গোডাউনে কতজন শ্রমিক কাজ করছিলেন, সে বিষয়ে কোনও রেজিস্টার খাতাই ছিল না।

    শম্ভুনাথ বেহরা ছাড়া যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁরা হলেন— লেবার সাপ্লায়ার কাম ট্রিম্যাক্স কনট্র্যাক্টর দিবাকর ভাণ্ডারী, পুরসভার প্ল্যান স্যাংশনের ক্ষেত্রে ব্রোকার বা দালাল আব্দুল হামিদ, গোডাউন নির্মাণের দায়িত্বে থাকা ‘অয়ন ট্রের্ডাসে’র সুপারভাইজ়ার গুলজ়ার হুসেন, আয়রন স্ট্রাকচার ফ্রেবিকেটর বা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার কমল সামন্ত। কী ভাবে এই রকম একটি নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হলো, সেই প্রসঙ্গ তুলে এ দিনই কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ওএসডি কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সরাসরি উল্লেখ করেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁকেও বৃহস্পতিবার আটক করে রাত পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা।

    পুলিশ সূত্রের খবর, শম্ভুনাথকে নিউ আলিপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি পার্টনারশিপে চায়ের ব্যবসা করেন। আগে তাঁদের তিন ভাইয়ের ব্যবসা ছিল। বর্তমানে শম্ভুনাথ ও তাঁর স্ত্রী মিলে পার্টনারশিপে ব্যবসা চালাচ্ছেন। তদন্তকারীদের দাবি, শম্ভুনাথ পোর্টের জমি ৩০ বছরের জন্য লিজ় নিয়ে গোডাউন ও কোল্ড স্টোরেজ বানাচ্ছিলেন।

    অতিরিক্ত কমিশনারল (ক্রাইম) কুণাল আগরওয়াল জানান, ধৃত অন্যদের মধ্যে গুলজ়ার হুসেনের বিরুদ্ধে মারধরের একটি মামলায় ২০১৮–তে একবালপুর থানা চার্জশিট জমা দিয়েছে। মৃতদের তালিকায় থাকা একবালপুরের বাসিন্দা আসগর হুসেনও ‘অয়ন ট্রের্ডাসে’র কর্তা ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ২০১৮–তে অপহরণ ও তোলাবাজির অভিযোগে চার্জশিট দিয়েছিল পুলিশ। এ ছাড়াও আসগরের বিরুদ্ধে ২০১৩–তে সাউথ পোর্ট থানায় মারধরের মামলায় চার্জশিট হয়েছিল।

    পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃত গুলজ়ার ‘অয়ন ট্রের্ডাসে’র সুপারভাইজ়ারের দায়িত্ব সামলাতেন। তারাতলার ওই সাইটে সঠিক ভাবে কাজ হচ্ছিল কি না, তা দেখভালের দায়িত্ব ছিল গুলজ়ারের। গোডাউনে লোহার শেড, গেট, সিঁড়ির ওয়েল্ডিং–সহ বিভিন্ন লোহার কাঠামো তৈরির দেখভালের দায়িত্ব ছিল কমলের। দিবাকরের দায়িত্ব ছিল, ওই সাইটে শ্রমিক সরবরাহ করা এবং ছাদ, পিলার, ফ্লোরের ঢালাইয়ের কাজ তত্ত্বাবধান করা। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, কলকাতা পুরসভার কাছ থেকে এই গোডাউনের প্ল্যান ঘুরপথে স্যাংশন পাইয়ে দেওয়ার জন্য শম্ভুনাথ কাজে লাগিয়েছিলেন আব্দুল হামিদকে। কিন্তু পুরসভার কোনও আধিকারিকের যোগ ছাড়া কী ভাবে একজন ব্রোকার স্যাংশন পাইয়ে দিলেন, তা তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন। তারাতলার ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা স্বতঃপ্রণোদিত মামলায় হামিদ ছাড়া ধৃত বাকিদের প্রত্যেকের নামই আছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৫ (অবহেলা কারণে মৃত্যু), ১১০ (অনিচ্ছাকৃত মৃত্যু ঘটানো), ৩(৫) (সম্মিলিত অপরাধ) ধারায় মামলা করা হয়েছে।

    পুলিশ আরও যে বিষয়গুলি খতিয়ে দেখছে, সেগুলি হলো— স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারের প্ল্যানে ভুল ছিল, নাকি পরে প্ল্যান বদল করা হয়? পুরসভা প্ল্যানের অনুমতি দিয়েছিল কীসের ভিত্তিতে? সেখানে সঠিক মানের সরঞ্জাম ব্যবহার হচ্ছিল কি? শ্রমিকদের উপযুক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল? লালবাজারের দাবি, ইতিমধ্যে তারা একটি চিঠি দিয়েছে কলকাতা পুরসভাকে। সেখান থেকে নথি পেলে পুর আধিকারিকদের কয়েকজনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করার পর্ব শুরু হবে।

    কুণাল জানান, কলকাতা পুলিশের সিট তদন্তের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের সাহায্য নেবে। কাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তার একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে যাঁদের জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁদের সঙ্গেও কথা বলতে পারে পুলিশ। বুধবার ঘটনার আগে মহম্মদ আতাউল, সুভাষ চৌধুরী–সহ তিনজন গোডাউন থেকে বেরিয়ে চা খেতে গিয়েছিলেন। তাঁদেরও বয়ান নেওয়া হয়েছে।

    ধৃত পাঁচ অভিযুক্তকে এ দিন আলিপুর আদালতে পেশ করা হয়। সরকারি কৌঁসুলি সৌরিন ঘোষাল দাবি করেছেন, ‘তারাতলার ওই সাইটের স্যাংশন প্ল্যান বের করার জন্য ২০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয় কলকাতা কর্পোরেশনকে। নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য ২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে নিম্নমানের লোহা, টিন, রড ইত্যাদি ব্যবহার হয়েছে।’ তিনি টেনে আনেন ২০১৩–তে মহারাষ্ট্রের ঠানেতে বহুতল ভেঙে পড়ার ঘটন‍ার প্রসঙ্গও। তাঁর দাবি, তারাতলার ঘটনাতেও আরও অনেকে জড়িত। অভিযুক্তদের আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করেন। দু’পক্ষের সওয়াল–জবাব শুনে ৪ জুলাই পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয় আলিপুর আদালত।

    কলকাতা পুরসভা সূত্রে খবর, তারাতলার নির্মাণস্থলে পাইলিং ঠিক হয়নি। পিলার যতগুলি থাকা উচিত ছিল, তা ছিল না। পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এ দিন স্পষ্ট বলেছেন, ‘মানুষের জীবনের সঙ্গে কোনও আপস হবে না। অবৈধ নির্মাণ, গাফিলতি বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কঠোরতম ব্যবস্থা।’

  • Link to this news (এই সময়)