অভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, কাটোয়া
বাড়িতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবা। আনাজ বিক্রি করে সংসার চালান মা। অভাব–অনটনের সংসারে কিছু বাড়তি আয়ের জন্য কলকাতায় কাজে গিয়েছিলেন পূর্ব বর্ধমানে কাটোয়ার অগ্রদ্বীপের গাজিপুর গ্রামের বাসিন্দা রোহিত চৌধুরী। ইচ্ছে ছিল, শহরে কাজ করে বাড়িতে কিছু টাকা পাঠাবেন। বাবাকে ভালো ডাক্তার দেখাবেন। আর ভেবেছিলেন, টাকা জমিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হবেন। তারাতলায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় সব শেষ। ভগ্নস্তূপের নীচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয়েছে রোহিত চৌধুরীর (২০)।
কাটোয়া–২ ব্লকের গাজিপুরের চৌধুরীপাড়ার বাড়িতে রোহিতের দেহ এসে পৌঁছয় বৃহস্পতিবার। ছেলের দেহ দেখে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছেন রোহিতের মা নিলম চৌধুরী। বাবা বেনারসি চৌধুরীও শোকে পাথর। তাঁরা প্রত্যকেই চাইছেন, তদন্ত হোক তারাতলার নির্মীয়মাণ শেড তৈরির কাজের মান নিয়ে। অভিযুক্তদের কড়া শাস্তি চাইছেন গাজিপুরবাসী।
বেনারসি গত চার বছর হাঁটার ক্ষমতা হারিয়েছেন। মায়ের আনাজ বিক্রির টাকায় কোনও রকমে চলে সংসার। দুই ভাইয়ের মধ্যে রোহিত বড়, রোহন ছোট। সে অগ্রদ্বীপ স্কুলের এইটের পড়ুয়া। রোহিত ২০২৪–এ উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ইচ্ছে ছিল জমানো টাকায় আইটিআই-য়ে ভর্তি হবেন। রোহিতের সেই ইচ্ছে আর পূরণ হলো না। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা, মামা সুভাষ চৌধুরীর সঙ্গে ছ'মাস আগে কলকাতায় কাজে গিয়েছিলেন রোহিত। বুধবার রাতে সুভাষই রোহিতের বাড়িতে ফোন করে ভাগ্নের মৃত্যুসংবাদ দেন।
রোহিতের মা নিলম বলেন, 'ও আমাদের অভাবের সংসারে আলো জ্বালাতে চেয়েছিল। কিন্তু আমাদের ঘর অন্ধকার করে ছেলেটা চলে গেল।' রোহিতের এক দিদি নেহা চৌধুরী বলেন, 'ভাই মে মাসে বাড়ি এসেছিল। আমাদের বাড়ি গিয়েছিল। ভাই আইটিআই–তে ফিটার ট্রেডে পড়াশোনা করতে চেয়েছিল। তবে টাকার অভাবে উচ্চ মাধ্যমিকের পরে লেখাপড়া বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। ভাই চেয়েছিল, কাজ করে কিছু টাকা আয় হবে। সেই টাকা দিয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করবে। ওর স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে মোটা বেতনের চাকরি করবে। সব স্বপ্ন তারাতলার শেডের নীচে চাপা পড়ে গেল।' রোহিতের বাবা বেনারসির আক্ষেপ, 'চলার শক্তি আগেই হারিয়েছি, জীবনের শক্তিটাও হারালাম।'
তারাতলায় নির্মীয়মাণ শেডের নীচে চাপা পড়ে গুরুতর জখম হয়েছেন রোহিতের প্রতিবেশী রামপ্রসাদ চৌধুরী (২২)। তাঁর কোমর ভেঙেছে। মাথায় গুরুতর আঘাত। ডান–পা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। রামপ্রসাদের চিকিৎসা চলছে এসএসকেএম–এ। তিনিও দেড় মাস আগেই কাজে গিয়েছিলেন।