এই সময়: কখনও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাতের অন্ধকার। দিনে প্রতিকূলতা তৈরি করেছে দুর্যোগ। তার মধ্যেও আপ্রাণ, অক্লান্ত যুদ্ধ চলছে নিষ্প্রাণ কংক্রিটের স্তূপ সরিয়ে প্রাণের খোঁজ করতে!
তারাতলার বি২ ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডের গোডাউনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে বুধবার রাত পর্যন্ত পাঁচ জন মৃতের খোঁজ মিলেছিল। বৃহস্পতিবার সেই মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১১। তাঁদের মধ্যে রাতভর উদ্ধারকাজ চালিয়ে আরও পাঁচ জনের মৃতদেহ উদ্ধার হয় ঘটনাস্থল থেকে। হাসপাতালে ভর্তি থাকা গুরুতর আহতদের মধ্যে এক জনেরও মৃত্যু হয়েছে। তবে এ সবের থেকেও উদ্ধারকারীদের কাছে বড় চিন্তার হলো— ১,২২৬ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে থাকা এই গোডাউনের ধ্বংসস্তূপের আনাচে–কানাচে কোথায় এখনও রয়েছে প্রাণের স্পন্দন, সেটা খুঁজে বের করা!
কলকাতা পুলিশ, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, দমকল, সেনাবাহিনীর সদস্যরা বুধবার রাত পর্যন্ত বিশেষ আলোর ব্যবস্থা করে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালিয়ে গিয়েছেন। এ দিন দুপুরে আবার উদ্ধারকাজ চলাকালীন বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রপাত। ফলে দুপুরে ঘণ্টা দুয়েক উদ্ধারের কাজ সাময়িক বন্ধও রাখতে হয়। সেক্ষেত্রে বড় দুশ্চিন্তা তৈরি হয়, এই প্রবল বৃষ্টিতে না আবার ধ্বংসস্তূপে নতুন করে কোনও বিপর্যয় দেখা দেয়। তবে বুধবার দুপুরে যখন ওই নির্মীয়মাণ গোডাউন ভেঙে পড়ে, তখন ঠিক কত জন শ্রমিক সেখানে কাজ করছিলেন, তাঁদের কত জন এখনও নিখোঁজ— সেই সংখ্যাটাই যে নেই উদ্ধারকারীদের কাছে! ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের থেকেও একটা বড় বাধা তৈরি হয়েছে গোডাউনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার গাফিলতিতে। এ দিন কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) কুণাল আগরওয়াল জানান, কত জন শ্রমিক সেখানে কাজে যুক্ত, তাঁদের মধ্যে কত জন ঘটনার সময়ে কাজ করছিলেন, তার কোনও রেজিস্টারই মেনটেন করা হতো না।
‘অ্যাক্ট অফ গড’ নয়, তারাতলার বিপর্যয়ের নেপথ্যে যে নির্মাণকারী সংস্থা–সহ আরও অনেকের গাফিলতিই রয়েছে, সেটা সম্পর্কে নিশ্চিত পুলিশকর্তারা। বাংলার বিভিন্ন জেলা অথবা ভিন রাজ্য থেকে কত শ্রমিক সেখানে কাজ করছেন, সেই তালিকা না–থাকাটাই তো সবচেয়ে বড় গাফিলতির নিদর্শন বলে মত তদন্তকারীদের। এ দিন এই ঘটনায় ওই গোডাউনের জমির মূল লিজ়–হোল্ডার সংস্থা ‘বেহরা ব্রাদার্স’–এর কর্ণধার শম্ভুনাথ বেহরা সমেত আরও তিন জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ফলে গ্রেপ্তারির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল পাঁচ। পাশাপাশি কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ওএসডি কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের পরে রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধে পর্যন্ত উদ্ধারকাজ চালিয়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে যে পাঁচ জনের নিথর দেহ উদ্ধার হয়েছে, তাঁরা হলেন খিদিরপুরের বাসিন্দা আসগর হোসেন (৫৫), সুন্দরবনের বাসন্তীর সাহিল সর্দার (১৭), বিহারের মুঙ্গেরের ঘি কুমার (১৭), মেটিয়াবুরুজের বাসিন্দা হাসান ইমাম (৪৪) এবং আসানসোলের বাসিন্দা নবীন সিং (৪৪)। এঁদের মধ্যে নবীনের হাতের ট্যাটু দেখে তাঁকে শণাক্ত করেন বাড়ির লোকজন। বুধবারই আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল গণেশ কালিন্দীকে (৪৫)। এ দিন তাঁরও মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে এখনও চিকিৎসাধীন ১৯ জন, তাঁদের মধ্যে চার জনের অবস্থা গুরুতর।
তারাতলায় বিপর্যয়ে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এ দিন এক্স হ্যান্ডলে রাষ্ট্রপতি মুর্মু লিখেছেন, ‘অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। আমি নিহতদের পরিবারের উদ্দেশে গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।’ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। মৃতদের নিকটাত্মীয়দের প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে মাথাপিছু ২ লক্ষ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে। আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে সবরকম সাহায্য পান, তা নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকার দিন-রাত কাজ করে চলেছে। এ দিন বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘মুখ্যসচিব, পুর কমিশনার-সহ পদস্থ কর্তারা (বুধবার) রাত ৩টে পর্যন্ত স্পটে ছিলেন। আমরা আহতদের চিকিৎসার সমস্ত দায়িত্ব নিচ্ছি। মৃতদের পরিবার পিছু ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য করা হবে। দুর্ঘটনায় আহতদের প্রত্যেককে ১ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।’ পাশাপাশি একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটিও গড়েছে নবান্ন।
লিজ়–প্রাপক সংস্থার আধিকারিক ও অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পেরেছে, প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক কাজে আসতেন। ঘটনার দিন কমবেশি ৪০ জন কাজ করছিলেন বলে সূত্রের খবর। আপাতত সেই সংখ্যা মাথায় রেখেই চলছে উদ্ধারকাজ। তবে খুব সন্তর্পণে সরানো হচ্ছে ধ্বংসস্তূপের লোহার বিম, অ্যালুমিনিয়ামের শেড, কংক্রিটের চাঙড়। যাতে কোনও ভাবে সেটা সরাতে গিয়ে নীচে চাপা পড়ে থাকা কোনও জীবিত ব্যক্তির ক্ষতি না–হয়ে যায়। এ দিন বৃষ্টির ফলে ধ্বংসস্তূপের অবস্থা আরও বেহাল হয়েছে। তার মধ্যেও সতর্কতার সঙ্গে হাইড্রোলিক ক্রেন দিয়ে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ভারী ভারী লোহার বিম হাইড্রোলিক ক্রেনের সাহায্যে সরানোর কাজ চলছে। প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে বের করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘থার্মাল ইমেজিং সেন্সর’। এ দিন দুপুরে যখন প্রবল বৃষ্টি চলছিল, সেই সময়ে দৃশ্যমানতা একেবারে কমে যাওয়ায় উদ্ধারকাজে সাময়িক বিরতি পড়ে। তারপরে ফের চালু হয় উদ্ধারকাজ। রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এবং ইন্দ্রনীল খাঁয়েরা অকুস্থলে থেকে গোটা উদ্ধারপর্বে নজর রেখেছেন। কাউকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা গেলে যাতে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়, তার জন্য ঘটনাস্থলের কাছেই ‘মেডিক্যাল ক্যাম্প’ করেছে সেনা।