• লিভ ইন রিলেশন আর গোপনে নয়, পশ্চিমবঙ্গে UCC লাগু হলেই কী কী বদলের সম্ভাবনা? বিস্তারিত
    আজ তক | ২৬ জুন ২০২৬
  • প্রথম লাগু হয়েছিল উত্তরাখণ্ডে। তারপর অসম ও গুজরাতে। এবার পশ্চিমবঙ্গের পালা। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল বা UCC বিল সোমবার বিধানসভায় পেশ করতে পারেন বাংলার বিজেপি সরকার। পশ্চিমবঙ্গে এই বিল পাস হয়ে গেলে, বাংলা হবে দেশের চতুর্থ রাজ্য, যেখানে UCC লাগু হবে। 

    সোমবার মোট পাঁচটি বিল পেশ করা হবে বিধানসভায়। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ অভিন্ন দেওয়ানি বিধি ২০২৬ বিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় স্পিকার রথীন্দ্র বসুর ডাকা কার্যবিবরণী কমিটির বৈঠকে বিলটি পেশের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সোমবার বিল পেশের পরে তা নিয়ে বিতর্ক হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে বিলটি পাশ হয়ে যাবে বাংলায়। এখন প্রশ্ন হল, UCC বিল পাশ হলে ও পশ্চিমবঙ্গে এই বিধি লাগু হলে কী কী বদল ঘটবে?

    UCC বিল কী? 

    বিজেপি-র 'এক দেশ, এক বিধান' নীতির মধ্যে অন্যতম হল UCC বিল। মূলত ধর্ম-ভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনের বদলে এক এবং অভিন্ন আইন লাগু করা হয়। অর্থাত্‍ প্রত্যেক দেশবাসীর জন্য সমান আইন। কোনও ধর্ম ভিত্তিক ব্যক্তিগত আইন নয়। যা ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গ নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিকের জন্য বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক সন্তান গ্রহণ এবং সম্পত্তির অধিকারের মতো ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয়গুলি নিয়ন্ত্রণ করবে। বিজেপি-র নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, তাদের লক্ষ্য গোটা দেশজুড়েই এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা। সেই মতো একের পর এক রাজ্যে চালু হচ্ছে। ২০২৬ সালে অসম ও পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ইশতেহারে বিজেপি জানিয়েছিল, ক্ষমতায় এলে UCC লাগু করা হবে।

    UCC বিলের ইতিহাস

    ভারতে UCC নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। স্বাধীনতার আগে থেকেই দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের জন্য আলাদা আলাদা ব্যক্তিগত আইন চালু রয়েছে। বিয়ে, ডিভোর্স, উত্তরাধিকার, দত্তক নেওয়ার মতো বিষয়গুলি ধর্মভেদে ভিন্ন আইনে পরিচালিত হয়। স্বাধীনতার পর ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৪-এ বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতে সব নাগরিকের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার চেষ্টা করবে সরকার। এর উদ্দেশ্য ছিল, ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য একই ধরনের দেওয়ানি আইন তৈরি করা এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। তবে এত বছরেও সারা দেশে এই আইন কার্যকর হয়নি। কারণ, অনেকের মতে এতে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব রীতি-নীতি ও সংস্কৃতির উপর প্রভাব পড়তে পারে। ব্রিটিশ আমলে আইনের কিছু ক্ষেত্রে একতা আনার চেষ্টা হলেও, ব্যক্তিগত আইনগুলিকে মূলত অক্ষত রাখা হয়েছিল। সেই সময় ১৮৬৫ সালের ইন্ডিয়ান সাকসেশন অ্যাক্ট এবং ১৮৬৯ সালের ইন্ডিয়ান ডিভোর্স অ্যাক্ট-এর মতো কয়েকটি আইন প্রণয়ন করা হলেও, সেগুলি সীমিত ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল।

    UCC বিল অনুযায়ী বিয়ে, ডিভোর্স ও লিভ ইন রিলেশনে কী কী প্রস্তাব রয়েছে?

    পশ্চিমবঙ্গে এই বিল লাগু হলে বিয়ের ৬০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক হবে। বর্তমানে লিভ ইন রিলেশনের ক্ষেত্রে কোনও রেজিস্ট্রেশন লাগে না। অসমে সম্প্রতি লাগু হয়েছে UCC। সেখানে নিয়ম হয়ে গিয়েছে, UCC লাগু হলে লিভ ইন রিলেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। অর্থাত্‍ লিভ ইন রিলেশনেও সরকারকে জানাতে হবে। বিয়ে ও ডিভোর্সের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ৬০ দিনের মধ্যে না হলে ১০ হাজার জরিমানা দিতে হবে। 

    প্রস্তাবিত UCC-র লক্ষ্য হল, ধর্ম নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের জন্য বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার এবং দত্তক গ্রহণের ক্ষেত্রে একই ধরনের দেওয়ানি আইন কার্যকর করা। এই খসড়া আইনে বহুবিবাহ এবং একতরফা তিন তালাকের মতো প্রথা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবও রয়েছে। অর্থাৎ, ধর্মভিত্তিক পৃথক ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে সব নাগরিকের জন্য একটিই অভিন্ন দেওয়ানি আইন প্রযোজ্য করার কথা বলা হয়েছে।

    ধর্ম-ভিত্তিক আইন বনাম UCC

    বিয়ে, উত্তরাধিকার ও ডিভোর্সের ক্ষেত্রে ধর্মের ভিত্তিতে আইন আলাদা রয়েছে। ১৯৫৫ এবং ১৯৯৬ সালে হিন্দু আইনে একাধিক সংশোধন আনা হলেও, অতীতে মহিলারা সম্পত্তির মালিকানা ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সমান অধিকার পেতেন না। অন্যদিকে, মুসলিম ব্যক্তিগত আইনেও একাধিক বৈষম্যমূলক প্রথা ছিল, যার মধ্যে একতরফা তিন তালাক এবং বহুবিবাহ উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৫ সালের বহুল আলোচিত শাহ বানো মামলার পর বিষয়টি জাতীয় স্তরে বড় বিতর্কের জন্ম দেয়। এরপর ১৯৮৬ সালে মুসলিম উইমেন (প্রোটেকশন অব রাইটস অন ডিভোর্স) অ্যাক্ট প্রণয়ন করা হয়। এই আইনের ফলে বিবাহবিচ্ছেদের পর স্বামীর দীর্ঘমেয়াদি ভরণপোষণের দায় সীমিত হয়ে যায়, যা নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল।
  • Link to this news (আজ তক)