এই সময়: তারাতলার ওই ধ্বংসস্তুপ থেকে আবার একদিন মাথা তুলবে নতুন নির্মাণ। চারপাশের জনজীবন চলবে তার স্বাভাবিক নিয়মে। শুধু পাকাপাকি ক্ষত রয়ে যাবে সেই পরিবারগুলোয়, যাদের প্রিয়জনের অকালে চলে যাওয়ার সাক্ষী থেকেছে শহর।
তেমনই এক পরিবারের মেয়ে পুষ্পা রজক। কলেজে পড়েন। উত্তর ২৪ পরগনার ভাটপাড়ার বিবেকানন্দনগরে থাকেন। বাবা পাপ্পু রজক ছিলেন রাজমিস্ত্রি। ভাটপাড়ায় দিনমজুরের কাজ ছেড়ে পুষ্পার পড়াশোনার কথা ভেবেই কাজ নিয়েছিলেন তারাতলার সেই নির্মীয়মাণ গোডাউনে। হাসপাতাল থেকে খবর পেয়ে মা শিল্পীকে নিয়ে ছুটে যান পুষ্পা। অবাক চোখে চেয়ে থাকেন বাবার নিথর দেহটার দিকে। আর মেয়ের দিকে তাকিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন শিল্পী, কী করে চলবে সংসার!
ভাটপাড়ারই পূর্বাশায় বৃহস্পতিবার কৃষ্ণ চৌধুরীর দেহ এসে পৌঁছয়। তিনিও ছিলেন নির্মাণস্থলে। তাঁর স্ত্রী সুচিতা জনে জনে ডেকে বলছেন, ‘জানো! বুধবার সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ ফোন করে জানতে চেয়েছিল বাচ্চারা টিফিন খেয়েছে কিনা। বলেছিল ওরা যা খেতে চায় খাইয়ে দিও।’ তিন সন্তান এবং শাশুড়িকে নিয়ে কী ভাবে দিন চলবে, দিশেহারা সুচিতা।
কিডনির অসুখে কর্মহীন দাদা, স্ত্রী, ১৪ বছরের ছেলে ও ১০ বছরের মেয়েকে নিয়ে সংসার চলত গার্ডেনরিচের হাসান ইমামের। গোডাউনের সুপারভাইজ়ার তিনি। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর কাঠ হয়ে যাওয়া দেহ উদ্ধার হয়। মাসতুতো ভাই মহম্মদ আবদুল্লা বলেন, ‘মেয়েটাও শারীরিক ভাবে অক্ষম। পরিবার ওর ভরসাতেই ছিল। জানি না কী ভাবে চলবে।’
একবালপুরের আসগর হুসেনের পরিবারও এ দিন মর্গে উপস্থিত হয়েছিল। আসগর শ্রমিক সরবরাহের কাজে যুক্ত ছিলেন। বুধবার ঘটনার পরে তাঁর বিরুদ্ধেও পুলিশে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। বৃহস্পতিবার সকালে ধ্বংসস্তূপের তলা থেকে তাঁর দেহ উদ্ধারের পরে তামাদি হয়ে গিয়েছে সেই অভিযোগ। মর্গে ছিলেন তাঁর বড় মেয়ে রাজিয়া। শূন্য দৃষ্টি। কথা বলতে চাননি।
পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোলের রানিগঞ্জের লায়েকবাঁধের নবীন সিংয়ের হাতে ‘নবীন’ লেখা ট্যাটু দেখে শনাক্ত করা হয়েছে তাঁকে। বাড়িতে দশ বছরের ছেলে আরিয়ান আর ১৪ বছরের মেয়ে কোমল বসে রয়েছে দাদু জহর সিংয়ের কোল ঘেঁষে। মা আর বড়দাদা শহরে গিয়েছে ‘বাবা’–কে আনতে। প্রতিবেশী দুপুরে খাবার দিয়ে গেলেও তা ছোঁয়নি দুই ভাইবোন। দিন পনেরো আগেও বাড়িতে এসেছিলেন নবীন। কোমল বলছে, বুধবার সকাল ১০টা নাগাদ বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। বাড়ি থেকে ফোন করা হলে বাবা বলেছিল— ‘এখন কাজ করছি, পরে কথা বলব।’ সেই কথা আর হয়নি। হবেও না। রেলের জমিতে বাড়ি। নোটিস পড়েছে, ছাড়তে হবে তা–ও।
প্রতিবেশী ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ জেলার শালুকচাপড়া গ্রামে এখন শুধুই কান্নার রোল। গ্রামের গণেশ কালিন্দী দুর্ঘটনার পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গিয়েছেন। অথচ বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত সেই মৃত্যুর খবর পৌঁছয়নি তাঁর স্ত্রী বা সন্তানদের কাছে। পরিবারের ছবিটা মোটামুটি একই। শ্রম দিয়ে একাই সংসার টানতেন গণেশ। সঙ্গে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা। মেয়ে, কলেজ ছাত্রী মৌমিতা জানাচ্ছেন, গুজরাটে কাজ করতেন গণেশ। ২৫ দিন আগে বাড়ি এসেছিলেন। ১৫ দিন আগে কলকাতার এই সংস্থায় কাজে যোগ দেন। বৃহস্পতিবারই বাড়ি ফেরার কথা ছিল।
নদিয়ার চন্দ্রমা চৌধুরী কোতয়ালি থানার চৌধুরীপাড়ার বাসিন্দা। ছেলেটা এখনও নাবালক। ছোট মেয়েটার বয়স মাত্র চার বছর। বৃহস্পতিবার দুপুরে বাড়িতে এসে পৌঁছয় তাঁর দেহ। চার মেয়ে, এক ছেলের মধ্যে শুধু একটা মেয়ের বিয়ে দিতে পেরেছিলেন। পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য ছিলেন তিনি। মৃতের তালিকায় শুধু নাম হয়ে রয়ে গিয়েছেন তিনিও।