আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স এক সময়ে ছিল প্রযুক্তির বিস্ময়। মানুষের মেধার জয়গান। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরে সেই বিস্ময়ই রাজনীতির আঙিনায় নতুন অস্ত্র। আর তা মোটেই ভোঁতা নয়, বরং তীক্ষ্ণ এবং লক্ষ্যভেদী। গত কয়েক দিন ধরে পাঞ্জাব জুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে একটি ভিডিয়ো। তাতে দেখা যাচ্ছে, শিখ গুরুদের ছবিতে মদ ছেটাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মানের মতো দেখতে এক ব্যক্তি। সেই নিয়েই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক সংঘাত।
ভগবন্ত মান প্রথমে দাবি করেছিলেন, ভিডিয়োটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স দিয়ে তৈরি। পরে অকাল তখত একটি ফরেনসিক রিপোর্ট দেখিয়ে দাবি করে, এটা আসল। তখন মানের বক্তব্যও বদলে যায়। বলতে শুরু করেন, ভিডিয়োতে থাকা ব্যক্তি তিনি নন, তাঁর মতো দেখতে কেউ এই কাজ করেছে। বৃহস্পতিবার তিনি নতুন দাবি করেন, ক্যানাডার একটি হোটেলে তাঁর মুখোশ পরে এই ভিডিয়ো তৈরি করা হয়েছে।
পাঞ্জাবের রাজনীতিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স এখন প্রচার যুদ্ধের ভাষা। আম আদমি পার্টি, শিরোমণি অকালি দল এবং কংগ্রেস—তিন দলই প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে এআই দিয়ে তৈরি করা ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছে বলে অভিযোগ।
রাজনৈতিক নেতাদের এমন সব কাল্পনিক কথাবার্তা বলতে দেখা যাচ্ছে, যা তাঁরা বাস্তবে কোনও দিন বলেনইনি। এমনকি তাঁদের গলার আওয়াজও হুবহু নকল করা হচ্ছে। যদিও ভিডিয়োর এককোণে ছোট করে লেখা 'AI Generated' (এআই দ্বারা তৈরি)। কিন্তু দেখলে কোনটা সত্যি আর কোনটা ভুয়ো, বোঝা মুশকিল।
ভগবন্ত মানের এই রকমই একটি ভিডিয়ো পোস্ট করার অভিযোগ উঠেছে আকালি দলের বিরুদ্ধে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, অকাল তখতের একটি প্রশ্ন শুনে ক্ষুব্ধ ভগবন্ত মান ব্যাপক চোটপাট করছেন। এরপরে তাঁর স্ত্রী আর পুলিশ কর্তাদের একটি কাল্পনিক কথোপকথন দেখা যায়। সেখানে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী পুলিশকে ভুয়ো ফরেনসিক রিপোর্ট তৈরির নির্দেশ দিচ্ছেন। শেষে আসল সাংবাদিক সম্মেলনের আসল ভিডিয়ো ফুটেজ জুড়ে দেওয়া হয়, যাতে পুরো ভিডিয়ো সত্যি মনে হয়।
আম আদমি পার্টিও পিছিয়ে নেই। তাদের বিরুদ্ধে অকালি দলের প্রধান সুখবীর সিং বাদল আর তাঁর স্ত্রী হরসিমরত কৌর বাদলের মধ্যে একটি ব্যক্তিগত কথোপকথনের ভিডিয়ো তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার অভিযোগ উঠেছে। কংগ্রেসও একই পথ ধরেছে। তাদের তৈরি ভিডিয়োতে ভগবন্ত মান আর অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ভোট-কৌশল নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যাচ্ছে।
কী ভাবে তৈরি হচ্ছে এই মায়া-বাস্তব? রাজনৈতিক দলগুলির সোশ্যাল মিডিয়া টিমের লোকজন জানাচ্ছেন, উন্নত এআই সফটওয়্যারের সাহায্যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এমন ভিডিয়ো তৈরি করা সম্ভব। নেতার আসল ছবি, জনসভার পুরোনো বক্তৃতা থেকে সংগৃহীত কণ্ঠস্বর—সবকিছুকে এক সুতোয় বেঁধে, সবকিছুকে এক সুতোয় বেঁধে, ঠোঁটের নিখুঁত নড়াচড়ার ব্যাকরণ মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক-একটি অভূতপূর্ব ভিডিয়ো।
মিথ্যাকে সত্যের মতো দেখানোর ক্ষমতা গণতন্ত্রের সামনে বড় বিপদ বলে মেনে নিচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায় কোটি মানুষের মোবাইল ফোনে। পরে যখন জানা যায় সেটা ভুয়ো, ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গিয়েছে। প্রথম ধাক্কার সেই প্রভাব মস্তিষ্কে থেকে যায়।
অকালি দলের মুখপাত্র পরমবংশ সিং বন্টি রোমানা স্বীকার করে নিয়েছেন, মূলত রাজনৈতিক কৌতুক বা ব্যঙ্গের উদ্দেশ্যেই তাঁরা এআই ব্যবহার করছেন। তবে এর বিশ্বাসযোগ্যতা যে প্রশ্নের মুখে, তা মানছেন তিনিও। অন্যদিকে, বিজেপির সাফ দাবি, তারা এই ধরনের কাদা ছোড়াছুড়ির মধ্যে নেই। মাঠপর্যায়ের প্রচারই তাদের ভরসা। আপ মুখপাত্র নীল গর্গের কথায় ফুটে উঠেছে আদর্শ, ‘এআই মানুষের সঙ্গে ইতিবাচক যোগাযোগের মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু তা যেন চরিত্রহননের অস্ত্র না হয়ে ওঠে।’