অযোধ্যার রাম মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া অনুদান চুরির অভিযোগে আট জনের গ্রেপ্তারির পরেই নয়া মোড়। আচমকাই ইস্তফা ট্রাস্ট সচিব চম্পত রাইয়ের। ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর মূল দায়িত্বে ছিলেন তিনিই। রাম মন্দিরের চম্পত রাইয়ের সঙ্গে ইস্তফা দিয়েছেন ট্রাস্টের সদস্য অনিল মিশ্রাও। SIT-এর তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবারই আট জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সূত্রের খবর, ট্রাস্টের অভ্যন্তরে চলা চাপ এবং অনুদান সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত। সূত্রের খবর, ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর দিকে কারচুপির অভিযোগ উঠতেই, নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করলেন চম্পত রাইয়ের। যদিও এখনও পর্যন্ত চম্পত রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের হয়নি, তবু তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কের বাইরে রাখার যুক্তিতে তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন।
চম্পত রায় দীর্ঘদিন ধরে রাম মন্দির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট গঠনের পর থেকেই জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। মন্দির নির্মাণ, কো-অর্ডিনেশন এবং অনুদান ব্যবস্থাপনায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
রাম মন্দিরে জমা পড়া অনুদানের অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী গণনা ও হিসাব রক্ষায় বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। তদন্তে উঠে আসে যে অনুদান গণনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি এবং কর্মীর বিরুদ্ধে আত্মসাৎ ও আর্থিক কারচুপির অভিযোগ রয়েছে।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, অনুদান সংগ্রহ, নগদ টাকা গোনা, জমা পড়া সম্পদের রসিদ দেওয়া এবং অর্থ ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
রাম শঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নু যাদব
ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাইয়ের প্রাক্তন চালক হিসেবে পরিচিত এই টিন্নু যাদব। তিনি বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (VHP) কারসেবকপুরমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শুধু তাই নয়, রাম মন্দিরের অনুদানের টাকা গণনার কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি বলে অভিযোগ। এই বিতর্কে তিনিই সবচেয়ে আলোচিত মুখ। চম্পত রাইয়ের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্রের কারণেই বিতর্ক তুঙ্গে। অভিযোগ, দানবাক্সের চাবি তাঁর কাছেই থাকত এবং ট্রাস্টের সদস্যদের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তিনি অনেক ক্ষেত্রে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিতেন। তবে টিন্নু নগদ টাকা গণনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, কিছু ব্যক্তি ঈর্ষার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ তুলছেন।
রামশঙ্কর মিশ্র ওরফে রবি মিশ্র
অনুদানের টাকা গণনার কাজে যুক্ত ছিলেন lfvf। অভিযোগ, কর্মীদের সঙ্গে মিলে তিনি একটি চক্র গড়ে তুলেছিলেন এবং নিজের ছেলে ও জামাইকেও টাকা গণনার কাজে যুক্ত করেছিলেন।
অনুকল্প মিশ্র
রামাশঙ্কর মিশ্রের ছেলে অনুকল্প মিশ্রও অনুদানের টাকা গণনার কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি ট্রাস্টি অনিল মিশ্রের আত্মীয় বলেও জানা গেছে।
লভকুশ মিশ্র
রামাশঙ্কর মিশ্রের জামাই লাভকুশ মিশ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আত্মসাৎ করা অর্থ সরিয়ে ফেলার দায়িত্ব তাঁর ওপর ছিল। তদন্তের শুরুতে তাঁর বাড়ি থেকেও টাকা উদ্ধারের অভিযোগ ওঠে।
অবিনাশ শুক্লা
মন্দিরের এক পরিচারক হিসেবে পরিচিত অবিনাশ শুক্লার বিরুদ্ধে অর্থের কারচুপিতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, তিনি এই চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
মণীশ যাদব
টিন্নু যাদবের ভাইপো মনীশ যাদবও অনুদানের টাকা গণনার কাজে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বাড়ি থেকেও চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সুভাষ শ্রীবাস্তব
প্রাক্তন ব্যাঙ্ককর্মী সুভাষ শ্রীবাস্তব নগদ টাকা গণনার কর্মীদের দায়িত্বে ছিলেন।
করুণেশ পাণ্ডে
রসিদে কারচুপির অভিযোগ আনা হয়েছে করুণেশের বিরুদ্ধে। অর্থ গ্রহণের পরে যথাযথ রসিদ দেননি তিনি বলে অভিযোগ।
ট্রাস্ট নগদ অর্থ গণনার দায়িত্ব দিয়েছিল স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (SBI)-কে। পরে এসবিআই সেই কাজের জন্য একটি বেসরকারি সংস্থাকে নিয়োগ করে। অনুদানের অর্থ গণনার জন্য মোট ১৪ জনের একটি দল কাজ করত, যার মধ্যে ১১ জন ব্যাঙ্ক কর্মী এবং ৩ জন মন্দির ট্রাস্টের প্রতিনিধি থাকতেন।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্বোধনের পর থেকেই রাম মন্দিরে বিপুল পরিমাণ অনুদান জমা হতে শুরু করে। সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টের মোট আয় ছিল প্রায় ৩২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১৫৩ কোটি টাকা এসেছে অনুদান থেকে এবং ১৭৩ কোটি টাকা সুদ বাবদ আয়।
ট্রাস্ট জানিয়েছে, প্রতিদিন গড়ে ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার দর্শনার্থী মন্দিরে আসেন। সপ্তাহান্তে ও উৎসবের সময়ে এই সংখ্যা দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। সেই অনুদানের হিসাব নিয়েই বড় ধরনের গরমিলের অভিযোগ সামনে আসে। এর পরেই উত্তরপ্রদেশ সরকার একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করে। তদন্তকারীরা ট্রাস্টের একাধিক সদস্য ও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন। তাদের দেওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতেই এই গ্রেপ্তারি।