কলকাতা দেখতে এসেছিল কিশোর, ফিরছে দেহ, তারাতলায় সব শেষ
আজ তক | ২৬ জুন ২০২৬
কৈশোরের স্বপ্নগুলো সাধারণত খুব ছোট হয়। কেউ নতুন জায়গা দেখতে চায়, কেউ বড় শহরের আলো-ঝলমল রাস্তায় হাঁটার স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়েই কখনও কখনও জীবনের সব আলো নিভে যায়। এক কিশোরের বহুদিনের ইচ্ছা ছিল একবার কলকাতা শহরটাকে নিজের চোখে দেখবে। কাজের ফাঁকে ঘুরে দেখবে চেনা গল্পের অচেনা শহর। কিন্তু যে শহরকে এতদিন শুধু গল্পে চিনেছিল, সেই শহরই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ গন্তব্য। কয়েক দিনের আনন্দ, নতুন অভিজ্ঞতা আর অজস্র কৌতূহল মুহূর্তের মধ্যে চাপা পড়ল ধ্বংসস্তূপের নীচে। রেখে গেল শুধুই কান্না, হাহাকার আর অপূর্ণ থেকে যাওয়া এক কিশোরের স্বপ্ন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবনের বাসন্তী ব্লকের রামচন্দ্রখালি গ্রামের বাসিন্দা ১৬ বছর বয়সী সাহিল সর্দার কোনওদিন কলকাতা শহর নিজের চোখে দেখেনি। অথচ বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, এমনকি পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও এই শহরের কত গল্পই না শুনেছিল সে। হঠাৎ করে কলকাতা দেখার সুযোগ পেয়ে তাই আর হাতছাড়া করতে চায়নি। আর সেই ইচ্ছাই কাল হয়ে দাঁড়াল সাহিলের জীবনে। বুধবার দুপুরে তারাতলায় একটি নির্মীয়মাণ বহুতল ভেঙে পড়ার ঘটনায় মৃত্যু হয় তাঁর।
বৃহস্পতিবার ভোরে সেই দুঃসংবাদ পৌঁছয় রামচন্দ্রখালির বাড়িতে। খবর পেতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় পনেরো দিন আগে বাসন্তীর মুড়োখালি গ্রামে মামার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল সাহিল। তাঁর দুই মামাতো দাদা দীর্ঘদিন ধরে ভিন রাজ্যে প্লাম্বিংয়ের কাজ করেন। ইদের ছুটিতে বাড়িতে ফিরে নতুন করে বাইরে যাওয়ার আগেই কলকাতায় একটি নির্মাণকাজের বরাত পান তাঁরা। ঠিকাদারের নির্দেশে তারাতলার ওই নির্মীয়মাণ বহুতলে কাজ করতে আসেন তাঁরা। দাদারা কলকাতায় যাচ্ছেন শুনেই জেদ ধরে সাহিল। সেও যাবে, শহরটা নিজের চোখে দেখবে।
প্রথমে সাহিলের দাদা মোস্তাকিন গায়েন তাঁকে নিয়ে যেতে রাজি হননি। কিন্তু ভাইয়ের একরোখা আবদারের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়। দুই মামাতো দাদা এবং দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে কলকাতায় আসে সাহিল। দিনের বেলায় কাজ, আর কাজ শেষে দাদাদের সঙ্গে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে দেখা—এই কয়েক দিন যেন স্বপ্নের মতো কেটেছিল তার। বুধবারও প্রতিদিনের মতো সকলে কাজে গিয়েছিলেন তারাতলার সেই নির্মীয়মাণ বহুতলে। আচমকাই ভেঙে পড়ে বহুতলের একটি বড় অংশ। মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়েন সাহিল-সহ সব শ্রমিক। দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু হয়। গুরুতর জখম অবস্থায় উদ্ধার করা হয় মোস্তাকিন এবং তাঁর বাকি সঙ্গীদের। বর্তমানে তাঁরা এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরেও খোঁজ মেলেনি সাহিলের। পরিবারের উৎকণ্ঠা বাড়তেই থাকে। অবশেষে গভীর রাতে ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে উদ্ধার হয় বছর ষোলোর সেই কিশোরের নিথর দেহ। যে ছেলেটি কয়েক দিন আগেও কলকাতার অলিগলি ঘুরে নতুন শহরকে চিনছিল, সেই শহর থেকেই ফিরল সে নিথর হয়ে। বৃহস্পতিবার ভোরে মৃত্যুসংবাদ পৌঁছতেই রামচন্দ্রখালির বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া।
এক মুহূর্তে থেমে গেল এক কিশোরের স্বপ্ন, আর বুকভরা স্মৃতি নিয়ে আজ শুধু চোখের জল ফেলছেন তাঁর পরিবারের মানুষজন।