তারাতলা বিপর্যয়ের নেপথ্যের কারণ কী? দৈনিক স্টেটসম্যানকে কী জানালেন নির্মাণ ও কাঠামো বিশেষজ্ঞ চন্দ্রচূড় ভট্টাচার্য
দৈনিক স্টেটসম্যান | ২৬ জুন ২০২৬
রাজ্যের পালাবদলের পর রাজ্য সরকারের কাছে বড়সড় চ্যালেঞ্জ ছিল তারাতলা বিপর্যয় কীভাবে মোকাবিলা করবে। কিন্তু দুর্ঘটনার দিন থেকে আজ পর্যন্ত সরকারের পক্ষে যা যা করনীয় তাই করে হয়েছে। এত মানুষের প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া সরকারের সম্ভব নয়, তবে ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিকাঠামো তৈরি করার সুযোগ যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা না পায় তার পুরো বন্দবস্ত করছে সরকার।
তারাতলা বিপর্যয় একাধিক মৃত্যুতে উঠে আসছে একাধিক প্রশ্ন। নির্মাণের সরঞ্জাম নাকি নকশায় গলদ? বিপর্যয়ের ঘটনার পরেই হাত তুলে নিয়েছেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। তবে বিপর্যয়ের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম নির্মাণ ও কাঠামো বিশেষজ্ঞ চন্দ্রচূড় ভট্টাচার্যের কাছে।
দৈনিক স্টেটেসম্যানকে দেওয়ায় একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, প্রাথমিক প্রকৌশলগত মূল্যায়ন অনুযায়ী, তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামঘর ধসের ঘটনায় নির্মাণকালীন কাঠামোগত ব্যর্থতার একাধিক লক্ষণ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। উপরের স্ল্যাব ও ফ্লোর সিস্টেমের একটি বড় অংশের আকস্মিক ধসে বহু শ্রমিক ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েন,আহত হন এবং কয়েক জন মারাও যান। এই ঘটনা স্বাভাবিক ব্যবহারের সময় নয়, বরং নির্মাণপর্বে কাঠামোর স্থিতিশীলতা হারানোর ইঙ্গিত বহন করে।
সম্প্রতি ঢালাই করা আর.সি.সি. স্ল্যাবে কংক্রিট পর্যাপ্ত শক্তি অর্জনের আগেই অতিরিক্ত ভার প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে। নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি এবং শ্রমিকদের সম্মিলিত লোড স্ল্যাবের অস্থায়ী ভারবহন ক্ষমতাকে অতিক্রম করায় স্থানীয়ভাবে ব্যর্থতা শুরু হয় এবং দ্রুত পার্শ্ববর্তী অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
দৈনিক স্টেটসম্যান এর প্রশ্ন ছিল বিপর্যায়ের সম্ভাব্য কারণ কি? উত্তরে চন্দ্রচূড় ভট্টাচার্য জানান, অন্যান্য কারণ গুলির মধ্যে আরও একটি সম্ভাব্য কারণ হল অস্থায়ী শাটারিং, স্টেজিং, প্রপস এবং সেন্টারিং ব্যবস্থার ব্যর্থতা। অপর্যাপ্ত ব্রেসিং, অপরিকল্পিত বা দুর্বল সাপোর্ট, স্টেজিংয়ের বসে যাওয়া কিংবা স্টিল প্রপের বাকলিংয়ের ফলে স্ল্যাব হঠাৎ নিচে নেমে যেতে পারে। এর ফলে সৃষ্ট অভিঘাতজনিত বল বিম ও কলামের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং ক্রমান্বয়ে গোটা কাঠামো ধসের দিকে এগিয়ে যায়।
ঘটনাস্থলে স্টিলের বিম ও কলামে যে মারাত্মক বিকৃতি—বাঁকনো, বকলিং ও মোচড় দেখা গিয়েছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । অতিরিক্ত লোড, অপর্যাপ্ত সেকশন, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, পার্শ্বীয় রেস্ট্রেইন্টের অভাব কিংবা সংযোগস্থলের ব্যর্থতার কারণে সাধারণত এ ধরনের বিকৃতি দেখা যায়। কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিম বা কলাম স্থিতিশীলতা হারালে তার ভার পার্শ্ববর্তী সদস্যগুলির ওপর স্থানান্তরিত হয় এবং সেখান থেকে একের পর এক ব্যর্থতার শৃঙ্খল তৈরি হতে পারে।
স্ট্রাকচারাল স্টিল সেকশন ও গুণমান, ওয়েল্ডিং, সংযোগ ব্যবস্থা, কংক্রিটের মান, রডের ডিটেলিং এবং নির্মাণপদ্ধতি, অপর্যাপ্ত কিউরিং, দুর্বল রডের বিন্যাস, ভুল ব্যাচিং, ত্রুটিপূর্ণ ওয়েল্ডিং কিংবা কাঠামোগত উপাদানের ঘাটতি নির্মীয়মাণ ভবনের ভারবহন ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে।
উপর থেকে স্ল্যাব ভেঙে পড়লে স্বাভাবিক নকশাগত লোডের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি অভিঘাতজনিত বল সৃষ্টি হয়, যা কলামকে বাঁকিয়ে দিতে, বিমকে মোচড়াতে এবং সংযোগস্থলকে ছিঁড়ে ফেলতে সক্ষম।বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে শাটারিং ও স্টেজিং ব্যবস্থার ব্যর্থতা, পর্যাপ্ত শক্তি অর্জনের আগেই কংক্রিটের উপর অতিরিক্ত লোড প্রদান, নকশাগত বা নির্মাণজনিত ত্রুটি এবং উপকরণের গুণগত সমস্যাকে সম্ভাব্য প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। যদিও ভিত্তি-সংক্রান্ত সমস্যার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম, বিস্তারিত তদন্ত ছাড়া তা সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
দৈনিক স্টেটসম্যানের প্রশ্ন ধসের প্রকৃত কারণ কী?
উত্তরে চন্দ্রচূড় ভট্টাচার্য বলেন,ধসের প্রকৃত কারণ এবং ঘটনাক্রম নির্ধারণের জন্য স্ট্রাকচারাল অডিট, উপকরণ পরীক্ষা, স্টিল সদস্য ও সংযোগস্থলের বিশ্লেষণ, নকশা নথিপত্র পর্যালোচনা এবং নির্মাণ-সংক্রান্ত রেকর্ড যাচাইসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক তদন্ত অপরিহার্য।