চাকরি শেষে আয়েশি নয়, নিঃস্বদের ছাদ দিতে জীবনের সব সম্বল উৎসর্গ!প্রবীণের একা হাতে মানবতার ‘তপবন’
News18 বাংলা | ২৬ জুন ২০২৬
: পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়ার দুর্গাচকের ছোট্ট গ্রাম বানেশ্বর চক থেকে শুরু হওয়া এক সাধারণ জীবনের পথচলা আজ পৌঁছেছে মানবসেবার এক অসাধারণ অধ্যায়ে। প্রায় ৩৯ বছর এনটিপিসি-তে কর্মজীবন কাটিয়ে, ডেপুটি ম্যানেজার পদ থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বরে অবসর নেওয়ার পরও থেমে থাকেননি কমলেশ কুমার পাত্র। বরং জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ও অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে রাজগঞ্জের সন্ন্যাসীকাটা এলাকায় গড়ে তুলছেন ‘আমাদের তপবন শান্তি সেবাশ্রম’, যা ইতিমধ্যেই বহু মানুষের আশার আলো হয়ে উঠছে।
শৈশব থেকেই সাহিত্য, শিল্পকলা ও মানবসেবার প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। বাবার গড়ে তোলা পারিবারিক পাঠাগারের আবহে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি একসময় মাটির মূর্তি নির্মাণ, কবিতা ও গান লেখা, এমনকি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত করেন। ‘স্বপ্ন স্বর্গ’, ‘কল্পনা’ ও ‘মুক্ত মনের মাঠে’ সহ একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। আকাশবাণী শিলিগুড়ির ‘প্রত্যুষা’ অনুষ্ঠানেও নিয়মিত লেখালেখি করে চলেছেন তিনি।
১৯৮৬-৮৭ সালে এক বন্ধুর বাবাকে সুস্থ করে তোলার অভিজ্ঞতাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই ঘটনার পর থেকেই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন বুকে লালন করতে থাকেন। ১৯৯৮ সালে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনা শুরু করে ২০০২ সালে ডিগ্রি সম্পূর্ণ করেন। চাকরির পাশাপাশি চিকিৎসা পরিষেবা চালিয়ে গেছেন এবং বহু মানুষকে নেশামুক্ত জীবনেও ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, “মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছেটা করোনাকাল থেকেই আরও প্রবল হয়ে ওঠে। বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ও নেতাজির আদর্শ আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে। অবসরের পর বিশ্রাম নেওয়ার কথা ভাবিনি, বরং মনে হয়েছে জীবনের বাকি সময়টা মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করাই প্রকৃত সাধনা।”
আরও এক বক্তব্যে তিনি বলেন, “২০২৪ সালের ১ জুন সাড়ে চার বিঘা জমি কিনে ‘আমাদের তপবন শান্তি সেবাশ্রম’-এর কাজ শুরু করি। এখনও প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ বাকি। নানা বাধা, অসাধু মানুষের হুমকি ও দালালচক্রের সমস্যার মধ্যেও আমি থামিনি। আমার স্বপ্ন—এখানে বৃদ্ধাশ্রম, অনাথ আশ্রম, গুরুকুল, ভেষজ উদ্যান, যোগকেন্দ্র, চিকিৎসা পরিষেবা ও কুটির শিল্প গড়ে তুলে যাদের কেউ নেই, তাদের আশ্রয় দেওয়া।” বর্তমানে জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ ব্লকের জামাদারগছ-পাগলারহাট এলাকায়, বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে, চা বাগান ঘেরা পরিবেশে একাই বসবাস করে আশ্রমের প্রতিটি কাজ সামলাচ্ছেন তিনি। গ্রামের মানুষ তাঁকে স্নেহভরে ‘দাদু’ বলে ডাকেন। ৬৫ বছর বয়সেও ম্যারাথন দৌড়, লেখালেখি, পড়াশোনা এবং মানবসেবার কাজে সমানভাবে সক্রিয় এই মানুষটি আজকের সমাজে এক বিরল উদাহরণ। তাঁর স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায় রয়েছে একটি চ্যারিটেবল ট্রাস্ট এবং কিছু সৎ, মানবিক সহযাত্রীর হাত।