• মেয়ের আবদারেই লুকিয়ে বাবার ‘প্রাণভোমরা’, জীবন ফিরে পেলেন তারাতলার গোডাউনের মিস্ত্রি
    এই সময় | ২৬ জুন ২০২৬
  • ‘বাবা, আজ আর কাজে যেতে হবে না।’ জগদ্দলের মোমিনপাড়ার একচিলতে ঘরে সবে ভোরের আলো ফুটছে। বেরোনোর তোড়জোড় করছিলেন ধর্মেন্দ্র চৌধুরী। তারাতলার নির্মীয়মাণ গোডাউনে ঢালাই মিস্ত্রির কাজের বরাত পেয়েছিলেন। বুধবার ভোর ভোর বেরিয়ে পড়ার কথা ছিল। তার আগেই ছুটে এসে কোমর জড়িয়ে ধরল মেয়ে। কিছুতেই আর ছাড়তে চায় না! মেয়ের আবদার শেষ পর্যন্ত ফেলতে পারেননি ধর্মেন্দ্র। ঠিক করেন, আজ আর কাজে যাবেন না। সেটাই আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়।

    দৈনিক ৭০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন ধর্মেন্দ্র চৌধুরী। ওই টাকাতেই তিনি খুশি। তবে বাড়তি রোজগারের আশা কার না থাকে। ধর্মেন্দ্ররও ছিল। ঠিকাদার জানিয়েছিল, ৩০০ টাকা বেশি মিলবে। মানে দিনে হাজার টাকা। সংসারের কথা ভেবে এক মুহূর্ত দেরি করেননি। সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে তিনি। কিন্তু নিয়তি অন্য রকমের চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। আর তার সূত্রধর হয়ে দাঁড়াল তাঁরই পাঁচ বছরের মেয়ে।

    কাজের জিনিসপত্র নিয়ে তিনি সবে বেরোতে যাবেন, তখনই ছুটে এল মেয়ে। সোজা বাবার কোমর জড়িয়ে আদুরে গলায় বলে উঠল, ‘বাবা, আজ আর কাজে যেতে হবে না।’ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মোচড় দিয়ে ওঠে ধর্মেন্দ্রর মন। তাঁর যে কী মনে হলো, ঠিক করলেন, থাক। একদিন কাজে না গেলে কী-ই বা যায় আসে। ধর্মেন্দ্র বলে দেন, ‘ঠিক আছে, আজ আর কাজে যাব না।’ মেয়ের সে কী আনন্দ। লাফাতে লাফাতে খেলতে চলে যায় সে।

    জীবন কখনও কখনও থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু সময় এগিয়ে চলে নিজের গতিতে। ধর্মেন্দ্রর জায়গায় কাজে যান সন্দীপ পান্ডে। সেই খবর অবশ্য ধর্মেন্দ্র জানতেন না। বিকেলের দিকে খবর শুনে শিউড়ে ওঠেন তিনি। হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছে তারাতলার সেই নির্মীয়মাণ গোডাউনের ছাদ। ভিতরে আটকে পড়েছেন অসংখ্য শ্রমিক। কারও মাথা থেঁতলে গিয়েছে, কারও হাত কেটে বাইরে ঝুলছে। আবার চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছে কারও শরীর। সন্দীপও রক্তাক্ত। কোনও রকমে তাঁকে উদ্ধার করে ভর্তি করানো হয়েছে এসএসকেএমের ট্রমা কেয়ার সেন্টারে। সেই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে।

    শুক্রবার সন্দীপকে দেখতে এসএসকেএমে গিয়েছিলেন ধর্মেন্দ্র। বেডে শুয়ে আছেন বন্ধু। তাঁকে দেখছেন, আর নিজের অবধারিত মৃত্যুটা যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ধর্মেন্দ্রর। ভাগ্যিস মেয়ের কথা শুনেছিলেন। চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল তাঁর। চট করে মুছে ধরা গলায় বললেন, ‘মেয়ে আমার লক্ষ্মী। ভাগ্যিস ওর কথা শুনেছিলাম।’ তার পরে থেমে গেলেন। কোনও রকমে মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘ও না থাকলে আমিও থাকতাম না।’ এ যেন মেয়ের ভালোবাসার টানই যমের দুয়ার থেকে ছিনিয়ে আনল বাবাকে।

  • Link to this news (এই সময়)