• ১৫০ টাকার টোপে লাখ টাকার ফাঁদ
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ২৭ জুন ২০২৬
  • নতুন রূপে, নতুন ছকে প্রতারণার ফাঁদ। আর সেই প্রতারণার টোপ হল চাকরি। হ্যাঁ, একদম ঠিক শুনছেন। সম্প্রতি ওয়ার্ক ফ্রম হোমের নামে শুরু হয়েছে এক নতুন ধরনের প্রতারণা। নিজের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ঘরে বসে আয় করতে পারবেন, এই স্লোগান দিয়েই প্রতারণার জাল বিস্তার করছে প্রতারকেরা।

    নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম সহ একাধিক বহুল ব্যবহৃত অ্যাপ। আর এই প্রতারকদের খপ্পরে পড়ছে সব বয়সী ছেলে, মেয়েরা। বিশেষ করে যারা চাকরি খুঁজছেন অথবা সদ্য চাকরি হারিয়েছেন—সেই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে প্রতারকেরা ছড়িয়ে দিচ্ছে জাল।

    ‘বিভিন্ন ধরনের পার্ট টাইম কাজের অফার। ইউটিউবের লিঙ্কে দিতে হবে লাইক, কমেন্ট ও বিভিন্ন সাইটের রিভিউ করতে বলা হবে আপনাকে। এমনকি কোনও ফাইভ স্টার হোটেল বা জনপ্রিয় রিসর্টের রেটিং দিতে হবে আপনাকে।’ জানালেন কলকাতার সাইবার পুলিশের এক আধিকারিক।

    প্রতিটা কাজের জন্য পঞ্চাশ টাকা করে দেওয়ার প্রলোভনই ইউএসপি প্রতারকদের। তিনটি কাজ করলেই অ্যাকাউন্টে দেড়শো টাকা জমা পড়বে। এর জন্য আপনাকে টেলিগ্রাম গ্রুপে সংযুক্ত করা হবে। সেই সঙ্গে একটি ফোন নম্বর দিয়ে আপনাকে ওদেরই এক রিসেপশনিস্টের সঙ্গে পরিচয় করানো হবে। তিনি আপনার ব্যাঙ্ক ডিটেইলস নেবেন এবং আপনার অ্যাকাউন্টে ওই দেড়শো টাকা জমা করবেন। ধাপে ধাপে ওই প্রতারকেরা অনেকগুলি কাজ দেবে ও আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হতে থাকবে।

    ‘এটা হল উপার্জন করানোর ফাঁদ। যত কাজ ততটাই উপার্জন। দু’ চার দিনের মধ্যেই এই গ্যাং আপনাকে ক্রিপটো বা বিট কয়েনে বিনিয়োগ করানোর জন্য চাপ দিতে থাকবে। পরে ওই টেলিগ্রাম গ্রুপেরই আরও এক ব্যাক্তির সঙ্গে আপনার পরিচয় করানো হবে। এই ব্যাক্তি আপনাকে বিনিয়োগ করার জন্য গাইড করবে এবং ওদের দেওয়া বিশেষ অ্যাপ থেকে ট্রেডিং অ্যাকাউন্টও খুলে দেবে। কিছুদিন পর ওদের সংস্থার নীতি অনুযায়ী আপনাকে প্রিপেড অপশানে যেতে হবে। না গেলে ওরা আপনাকে গ্রুপ থেকে সরিয়ে দেবে এবং আপনাকে আর কোনও কাজ দেবে না।’ ব্যাখ্যা করলেন সাইবার পুলিশের ওই আধিকারিক।

    প্রিপেড মানে ট্রেডিংয়ের আগে আপনাকে ওদের টাকা পেমেন্ট করে দিতে হবে। সেই অঙ্ক পাঁচ, দশ হাজার টাকা হতে পারে। সেই টাকার সঙ্গে আপনাকে ওরা ৩০ শতাংশ মুনাফা দেবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। এই ভাবে আপনি মুনাফার আশায় বিনিয়োগ করতে থাকবেন আর খাতায় কলমে আপনার টাকা ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। আপনার ট্রেডিং অ্যাকাউন্টে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা হয়ে যাবে। এখানেই খেলা।

    ফাঁদের এখানেই শেষ নয়, এরপর আপনাকে বলা হবে কয়েক লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করার জন্য। আত্মবিশ্বাসী হয়ে কাজটি করার সঙ্গে সঙ্গে আপনি প্রতারকদের জালে জড়িয়ে গেলেন পুরোপুরি। ফ্রিজ করে দেওয়া হবে আপনার  অ্যাকাউন্ট। ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বলবে আরও ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিনিযোগ করলে আপনি আগের বিনিয়োগ এবং পরে আরো দেওয়া টাকার উপরেই সুদ সহ ফেরত পাবেন। যদি না করেন তাহলে কিন্তু পুরো বিনিয়োগটাই আপনি হারাবেন–এই ভয় দেখিয়ে আপনাকে ফের বিনিয়োগের ফাঁদে ফেলা হবে।

    আপনি যখন বলবেন যে আপনি আর টাকা দিতে পারছেন না তখনই ওরা আপনাকে ওদের রিসেপশনিস্টের সঙ্গে যোগায়োগ করতে বলবে। রিসেপশনিস্ট বলবে ৭ থেকে ৮ লক্ষ টাকা ট্যাক্স দিতে হবে আপনাকে। আপনাকে বোঝানো ও সাহস দেওয়ার জন্য ওরা আপনার অ্যাকাউন্টে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা শ্যাডোও পেমেন্ট করবে।

    ‘এটি একটি ট্রিক। টাকা জমা করলেই বিপদ। ওরা আরও আপনাকে বলবে আপনি ট্যাক্স দিন আমরা তার ওপর আপনাকে আরও কমিশন দেব। এভাবেই আপনার সঞ্চিত টাকা আপনি হারিয়ে ফেলবেন। অ্যাকাউন্ট ফাঁকা হয়ে যাবে। তারপরেই বুঝতে পারবেন হারিয়ে গিয়েছিলেন একটি অলীক গোলকধাঁধায়।

    কলকাতা পুলিশের এক শীর্ষ কর্তা বলেন এই প্রতারণার ফাঁদে পা দেবেন না। এই ভাবেই কয়েক শ মানুষ তাঁদের সর্বস্ব হারিয়েছেন। সম্প্রতি কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে সমাজ মাধ্যমে এই বার্তা দেওয়া হচ্ছে নাগরিকদের।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)