বউয়ের কথা রাখতে গিয়েই প্রাণরক্ষা! তারাতলা বিপর্যয়ে জীবন বাঁচল ঝাড়খণ্ডের শ্রমিকের
প্রতিদিন | ২৭ জুন ২০২৬
কথায় আছে, রাখে হরি মারে কে? বিপদের সময়ে এই প্রবাদবাক্য যে কতটা যথাযথ, তা খুব ভালোভাবে টের পাওয়া যায়। বুধবার তারাতলায় নির্মীয়মাণ বাণিজ্যিক ভবনটি ভেঙে পড়ে (Taratala Factory Collapse) একাধিক মৃত্যু হলেও বড়সড় বিপর্যয় থেকে বরাতজোরে রক্ষা পেয়েছেন কয়েকজন শ্রমিক। তাঁদের বেশিরভাগ আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হলেও ‘মিরাকল’ ঘটেছে প্রদ্যুৎ মুণ্ডার জীবনে! বউয়ের কথায় জল আনতে যাওয়ায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য তিনি প্রাণে তো বেঁচেছেনই, একেবারে অক্ষত ঝাড়খণ্ডের এই শ্রমিক। স্ত্রী বোধন মুণ্ডা অবশ্য আহত। পা ভেঙেছে তাঁর, এসএসকেএমে তাঁর চিকিৎসা চলছে। প্রদ্যুৎ বলছেন, স্ত্রী জোর করে জল আনতে পাঠিয়েছিল বলেই এত বড় বিপর্যয়ের আঁচ লাগেনি তাঁর গায়ে। তবে জীবন বিপর্যস্তই।
বুধবার দুপুর ১২টার একটু পর থেকে গোটা কলকাতাজুড়ে একটাই খবর – তারাতলায় তাসের ঘরের মতো হুড়মুড়িয়ে নির্মীয়মাণ বাণিজ্যিক ভবন ভেঙে পড়া। টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলে ধ্বংসস্তূপের ছবি আর প্রাণ বাঁচানোর আর্তি ছাড়া অন্য কিছু চোখে পড়েনি। শহরে এত বড় দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৬। তা আরও বাড়তে পারে। তবে বিপর্যয় অনেকটাই সামলানো গিয়েছে রাজ্য সরকারের দ্রুত ‘অ্যাকশনে’র জেরে। দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজে হাত লাগিয়েছে একযোগে দমকল, বিপর্যয় মোকাবিলা দল, পুলিশ ও সেনাবাহিনী। ভেঙে পড়া বাড়ির লোহার টুকরো, সিমেন্টের চাঁইয়ের ভিতর থেকে কয়েকজন উদ্ধার করা হয়। তাঁদের মধ্যে কারও শরীর প্রাণহীন, কারও আবার আঘাতে আঘাতে ভর্তি। আহতদের ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। তারই মধ্যে একজন বোধন মুণ্ডা। এই প্রকল্পে কাজ করা একমাত্র মহিলা শ্রমিক, ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা। পেটের তাগিদে দুই ছোট সন্তানকে ঘরে রেখে স্বামী প্রদ্যুতের হাত ধরে চলে এসেছেন বাংলায়, ঢালাইয়ের কাজ করতে। আর ওইদিনের দুর্ঘটনায় নিজে আহত হয়ে স্বামীকে অক্ষত রাখা বোধন এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
ঠিক কী ঘটেছিল? শুক্রবার স্ত্রীকে দেখতে এসএসকেএম হাসপাতাল থেকে ফেরার সময় ‘সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল’কে তা খুলে বললেন প্রদ্যুৎ মুণ্ডা। তাঁর কথায়, ‘‘ও (বোধন মু্ণ্ডা) ওখানে ঢালাইতে জল দিত। সেদিন সবে কাজ শুরু করেছিল। হঠাৎ আমাকে বলল যে জল তেষ্টা পেয়েছে, আমি যেন বাইরে গিয়ে জল নিয়ে আসি। আমি বেরিয়ে গেলাম কাজের জায়গা থেকে। রাস্তা পেরিয়ে দোকানে গিয়ে ভাবলাম, নাস্তার জন্য একটু কিছু কিনে নিই। সঙ্গে সঙ্গে একটা বিকট আওয়াজ কানে এল। দেখলাম, ওই বিল্ডিংটা ভেঙে পড়েছে। আমি সব ছেড়ে ছুটে যাই ওখানে। দেখি অনেকে ভিতরে চাপা পড়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখলাম, পুলিশ, দমকল, অ্যাম্বুল্যান্স সব চলে এল, জায়গাটা ঘিরে ফেলল। সবাইকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।”
যতদিন কাজ করেছেন, কেমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল? এ প্রশ্নের জবাবে প্রদ্যুৎ মুণ্ডা স্পষ্টই জানালেন, শ্রমিকদের কারও মাথায় হেলমেট বা অন্য কোনও সুরক্ষাবিধি ছিল না। মেশিন চালালে লোহার বিমগুলো কাঁপত। সকলেই বুঝতেন যে কাজ ঠিকঠাক হচ্ছে না। তা সত্ত্বেও কেউ কোনও প্রশ্ন তোলেননি। এসব বলতে বলতে চোখে জল প্রদ্যুতের। বড় মনে পড়ছে ছেলেমেয়েগুলোর কথা। ১৩ বছরের মেয়ে আর ৭ বছরের ছেলেকে বাড়িতে রেখে আসতে হয়েছে পাশের রাজ্যে। স্ত্রী বোধন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে স্বামীকে বলছেন, ‘‘যদি দুজনই আহত হতাম, বাচ্চাগুলোর কী হতো? ওদের দেখত কে?” স্ত্রীর জল আনার বায়না সামলাতে গিয়েই অক্ষত রইলেন প্রদ্যুৎ। এও তো জীবনের এক নিয়তি!