হুগলির মুকুটে নয়া পালক। জিআই স্বীকৃতি পেল চন্দননগরের জলভরা, বলাগরের নৌ শিল্প, জনাইয়ের মনোহরা এবং বেগমপুরের শাড়ি। সম্প্রতি এই খবর এসে পৌঁছেছে জেলায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও আইনি পদ্ধতির পরে এই স্বীকৃতিতে উচ্ছ্বসিত কারিগর, শিল্পী ও বাসিন্দারা। তারকেশ্বরে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের সভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল জলভরা সন্দেশ।
বাংলার মিষ্টি ও লোকশিল্পের ইতিহাসে ভালো খবর। হুগলি জেলার চার প্রাচীন ঐতিহ্য, চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ, বলাগড়ের নৌকা শিল্প, জনাইয়ে মনোহরা এবং বেগমপুরের শাড়ি জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) ট্যাগ পেল। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও আইনি প্রক্রিয়ার পরে এই স্বীকৃতি মেলায় উচ্ছ্বসিত মিষ্টির কারিগর থেকে নৌ শিল্পী সকলেই। ওয়েস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল জুডিশিয়াল সায়েন্স ইউনিভার্সিটি প্রাক্তন চেয়ার প্রফেসর পিনাকী ঘোষও জানান, হুগলির বেগমপুরের শাড়ি, জনাইয়ের মনোহরা ও বলাগড়ের নৌ শিল্প জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে।
চন্দননগরের জলভরা শুধু সন্দেশ নয়, বাঙালির আবেগ। এই সন্দেশের সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে। চলতি মাসে তারকেশ্বরে পশ্চিমবঙ্গ দিবসে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁকে চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ দেওয়া হয়েছিল। চন্দননগরের মিষ্ঠান্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী শৈবাল মোদক বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসার জন্য চন্দননগরের জলভরা সন্দেশের জিআই পাওয়া প্রয়োজন ছিল। আমরা খুবই আনন্দিত। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে আমরা জিআই-এর জন্য আবেদন করি। চার বছর বাদে এই স্বীকৃতি পেয়েছি। চন্দননগরে সূর্য মোদকের একটা মূর্তি স্থাপন করার জন্য বিধায়কের কাছে আবেদন জানিয়েছি।’ আন্তর্জাতিক বাজারে জলভরা সন্দেশের প্রসার ঘটাতে রিসার্চ প্রয়োজন, তার জন্য সরকারকে উদ্যোগী হতে আবেদন করেছেন তিনি।
ডিঙি নৌকার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে হুগলি বলাগড়ের নাম। শিল্পীরা জানাচ্ছেন, কয়েকশো বছরের পুরোনো এই নৌকা তৈরির শিল্প। শুরুর দিকে ডিঙি নৌকা তৈরি হতো বলাগড়ে, তাতে কোনও পেরেক ব্যবহার করা হতো না। তার বদলে জোড় কাঠ (কাঠের সঙ্গে অন্য কাঠ জুড়ে) পদ্ধতি ব্যবহার হতো। এখন জুলুস পেরেক ব্যবহার করা হয়। নৌ শিল্পকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে রয়েছে বেশ কয়েকটি শিল্পী পরিবার। বলাগড়ের আঞ্চলিক গবেষক পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘চার বছরের একটা লড়াই। সারা ভারতে নানা জায়গায় নৌকা বানানো হয়। সুন্দরবন, কাকদ্বীপ ও জলপাইগুড়িতে নৌকো বানানো হয়, কিন্তু বলাগড়ের নৌ শিল্প অন্য রকম।’ জিআই পাওয়ার কাজে সাহায্য করেছিলেন অধ্যাপক পিনাকি ঘোষ ও শান্তনু পান্ডা। আইনি পদ্ধতিতে গবেষণাপত্র করে জমা দিতে হয়।
বলাগড় নৌ শিল্প সমেতির সম্পাদক উৎপল বারিক বলেন, ‘জিআই পাওয়ায় ফলে ভারতবর্ষের মানচিত্রে একটা জায়গা পেলাম তাতে আমরা খুশি। কিন্তু আর্থিকভাবে কতটা লাভবান হলাম বলতে পারব না। আমাদের নৌকা প্রধানত ব্যবহার করেন মৎস্যজীবীরা। তাঁরা আর্থিকভাবে দুর্বল। সেই কারণে আমরাও উপযুক্ত দাম পাচ্ছি না।’
মনোহরা যাতে জিআই ট্যাগ পায় তার জন্য চণ্ডীতলার জনাইয়ের দশ জন আবেদন করেছিলেন। তার মধ্যেই একজন স্বপন দাস। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ দিন ধরে আমরা চেষ্টা করছিলাম।’ তিনি জানাচ্ছেন, জমিদার আমলে সন্দেশের স্থায়িত্ব বাড়াতে মিষ্টির উপর চিনি বা গুড়ের কোটিং দেওয়া শুরু হয়েছিল।
বলাগড়ের বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী সুমনা সরকার বলেন, ‘নৌ শিল্পীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, সেটা পূরণ হল। বিজেপি সরকার কথা দিয়ে কথা রেখেছে। মানুষ ভরসা করেছেন, এর জন্য আমরা গর্বিত। ধন্যবাদ জানাই মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীকে।’