জলভরা সন্দেশ থেকে মনোহরা আর বলাগড়ের ডিঙি নৌকা, জিআই স্বীকৃতি পেল হুগলির তিন 'রত্ন'
eTV Bharat | ২৭ জুন ২০২৬
হুগলি, 26 জুন: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ ও বলাগড়ের নৌকা জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন) স্বীকৃতি পেল ৷ জনাইয়ের মনোহরাও ভারত সরকারের এই বিশেষ স্বীকৃতি পেয়েছে ৷ সবমিলিয়ে হুগলির মুকুটে নয়া পালক ৷ চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ থেকে জনাইয়ের মনোহরা মিষ্টি ও বলাগরের নৌকা স্বীকৃতি পাওয়ায় খুশি মিষ্ঠান্ন ব্যবসায়ী ও নৌ-শিল্পীরা ৷
মিষ্টি প্ৰিয় বাঙালির কাছে জলভরা সন্দেশের বিকল্প নেই ৷ আগামিদিনে এই মিষ্টিকে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার দাবি উঠেছে জেলাবাসীর তরফে ৷ সেই সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া নৌ-শিল্পের পুনরুজ্জীবনে সরকারি পদক্ষেপের দাবি তুলেছেন শিল্পীরা ৷
জলভরার গল্প
সেই উনিশ শতক থেকে সূর্য মোদকের জল ভরা সন্দেশ 'জামাই ঠকানো মিষ্টি' নামেই খ্যাত ৷ লোক মুখে প্রচলিত তেলিনি পাড়ার বন্দোপাধ্যায় পরিবার, তাদের বাড়ির জামাইদের ঠকানোর জন্য এই মিষ্টি তৈরির অর্ডার দিয়েছিল ৷ তাল শাঁসের আকারের সন্দেশের মধ্যে গোলাপ রস ভরে এক অদ্ভুত মিষ্টির জন্ম দেন কিংবদন্তি সূর্য মোদক ৷ সেই সন্দেশ স্বাদে অত্যন্ত সুস্বাদু ৷ তালশাঁসের মতো দেখতে এই মিষ্টির মধ্যে জল ভরা ৷ সেই থেকে 'জলভরা' নামেই বিখ্যাত চন্দননগরে ৷ এখন চকলেট, ম্যাংগো স্ট্রবেরি-সহ একাধিক স্বাদের জলভরা তৈরি হচ্ছে ৷
চন্দননগরের এই মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী শৈবাল মোদক বলেন, "চন্দননগরের জলভরা সন্দেশের সর্বভারতীয় স্তরে একটা সুনাম রয়েছে ৷ আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসার জন্য জিআই ট্যাগ পাওয়ার প্রয়োজন ছিল ৷ জলভরা সন্দেশ জিআই পাওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত ৷"
জিআই পাওয়ার পরীক্ষা নিয়ে তিনি বলেন, "2022 সালে সেপ্টেম্বর মাসে আমরা জিআই এর জন্য আবেদন করি ৷ দীর্ঘ চার বছর বাদে এই স্বীকৃতি পেয়েছি ৷ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এই মিষ্টি উত্তীর্ণ হয়েছে ৷ সূর্য মোদকের জলভরা এখন থেকে 'চন্দননগরের জলভরা' হিসেবেই পরিচিতি পাবে ৷ আমরা চাই চন্দননগরে সূর্য মোদকের একটা মূর্তি স্থাপন করা হোক ৷ তার জন্য বিধায়কের কাছে আবেদন জানিয়েছি ৷ আন্তর্জাতিক বাজারে জলভরা প্রসার ঘটাতে গেলে মিষ্টির মেয়াদ বাড়াতে হবে ৷ এর জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিয়ে রিসার্চ করতে হবে ৷ তবেই 'জলাভরা' বিদেশের বাজারে মর্যাদা পাবে ৷ ব্যবসার নানা দিক খুলে যাবে ৷"
বলাগড়ের ক্ষীয়মান নৌশিল্প
বলাগরের নৌ-শিল্প প্রায় পাঁচশো বছরেরও বেশি প্রাচীন ৷ প্রথম দিকে ডিঙি নৌকার পর বড় নৌকা তৈরি হয় বলাগড়ে ৷ হুগলি জেলা নদীমাতৃক সভ্যতার অংশ ৷ সপ্তগ্রাম বন্দর থাকার জন্য এই নৌকার বাজার ছিল ৷ ইউরোপের একাধিক দেশ হুগলিতে উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল । তাই বলাগড়ের শ্রীপুর, রাজবংশীপাড়া, চাঁদরা, তেতুলিয়ায় রয়েছে নৌকার কারখানা ৷ এখান থেকে কাঠের নানারকম নৌকা যেত দেশ-বিদেশে ৷ এখনও 12 থেকে 28 ফুটের নৌকা তৈরি হয় ৷
আগে কয়েকশো নৌকা তৈরির কারখানা ছিল ৷ প্রযুক্তির যুগে নৌকার ব্যবহার কমেছে ৷ এখন মাত্র 21টি কারখানা কোনওরকমে টিকে আছে ৷ পুরনোরাই এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ৷ শ্রমিকদের মজুরি কম ও নৌকার বিক্রি আগের থেকে অনেকটাই কমে যাওয়াতে নতুন প্রজন্ম কেউ এই শিল্পে আসছে না ৷
ঝাড়খণ্ড, উত্তর 24 পরগনার সুন্দরবন, নামখানা, কাকদ্বীপ-সহ বিভিন্ন জায়গায় নৌকা তৈরি ও বিক্রির ব্যবসা হয় ৷ বলাগড়ের নৌকার নেপথ্যে বহু প্রাচীন ইতিহাস থাকলেও এতদিন জিআই তকমা ছিল না ৷ আজ সেই স্বীকৃতি মিলল ৷ এবার নৌ-শিল্প বাঁচাতে সরকারি সাহায্যের দাবি জানাচ্ছেন শিল্পীরা ৷
গবেষক পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, "বলাগড়ের নৌ-শিল্পের জিআই পাওয়া প্রায় চার বছরের একটা বড় লড়াই ৷ সারা ভারতে অনেক জায়গায় নৌকা বানানো হয় ৷ আমাদের রাজ্যের সুন্দরবন, কাকদ্বীপ ও জলপাইগুড়িতেও নৌকো বানানো হয় ৷ কিন্তু বলাগড়ের নৌ-শিল্প অন্য রকম ৷ সেই ইতিহাসকে বিভিন্ন তথ্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে সাহায্য করেছিলেন অধ্যাপক ডক্টর পিনাকি ঘোষ ও ডক্টর শান্তনু পান্ডা ৷ পাঁচটি হেয়ারিংয়ের পর বলাগরের ডিঙি নৌকার স্বীকৃতি পেয়েছে ৷ আমরা বোঝাতে পেরেছিলাম নৌকার প্রথম ধাপ ছিল আমাদের এই ডিঙি নৌকা ৷"
এক নৌ-শিল্পী বলেন, "জিআই পাওয়ায় ফলে ভারতের মানচিত্রে একটা জায়গা পেলাম ৷ তাতে আমরা খুশি ৷ কিন্তু আর্থিকভাবে কতটা লাভবান হব, তা বলতে পারব না ৷" তিনি জানান, নৌকা প্রধানত ব্যবহার করেন মৎস্যজীবীরা ৷ তাঁরাও আর্থিকভাবে দুর্বল ৷ তাই নৌকার উপযুক্ত দাম পাওয়া যায় না ৷ নৌ-শিল্পীরাও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারছেন না ৷ জিআই স্বীকৃতি পর সরকারি সাহায্য না পেলে নৌ-শিল্পীদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা শিল্পীর ৷