সীমান্তে স্বস্তির হাসি ! বাংলাদেশিদের জন্য ফের খুলছে ভারতের পর্যটন ভিসার দরজা
eTV Bharat | ২৭ জুন ২০২৬
বনগাঁ ও কোচবিহার, 26 জুন: দীর্ঘ প্রায় দু'বছরের অপেক্ষার অবসান । আগামী 28 জুন থেকে বাংলাদেশের পাঁচটি বিভাগে ফের চালু হচ্ছে ভারতের পর্যটন ভিসা পরিষেবা । এই ঘোষণার পর থেকেই উত্তরবঙ্গের চ্যাংরাবান্ধা ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট থেকে উত্তর 24 পরগনার পেট্রাপোল স্থলবন্দর- দুই সীমান্তেই ফিরেছে আশার আলো । ভারত-বাংলাদেশের সাধারণ যাত্রী, ছোট ব্যবসায়ী, মানি এক্সচেঞ্জ সংস্থা, পরিবহণ ব্যবসায়ী থেকে হোটেল মালিক সকলেই মনে করছেন, দীর্ঘ মন্দার পর আবার চাঙ্গা হবে সীমান্তের অর্থনীতি ।
2024 সালের 5 অগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারত বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা দেওয়া কার্যত বন্ধ করে দেয় । জরুরি চিকিৎসার জন্য মেডিকেল ভিসা এবং সীমিত আকারে বাণিজ্যিক ভিসা চালু থাকলেও পর্যটক যাতায়াত প্রায় থমকে যায় । তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সীমান্তবর্তী এলাকার অর্থনীতিতে । বিশেষ করে চ্যাংরাবান্ধা ও পেট্রাপোলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরে ব্যবসা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চ্যাংরাবান্ধা ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট সংলগ্ন ব্যবসায়ীদের দাবি, গত দু'বছরে তাঁদের ব্যবসা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে । বাংলাদেশের গাইবান্ধার বাসিন্দা মেহেবুব আলম, যিনি বেঙ্গালুরুর একটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভারতে এসেছেন, বলেন, "ভারতে আসার পথেই শুনলাম 28 জুন থেকে পাঁচটি বিভাগে আবার টুরিস্ট ভিসা চালু হচ্ছে । এতে সাধারণ মানুষের যাতায়াত অনেক সহজ হবে । চিকিৎসার পাশাপাশি ভবিষ্যতে পরিবার নিয়ে ঘুরতেও আসা যাবে ।"
একই অভিমত বাংলাদেশের যাত্রী সোহানা আলমেরও । চিকিৎসার জন্য হায়দরাবাদ যাওয়ার পথে তিনি বলেন, "এখন শুধু মেডিক্যাল ভিসা পাওয়া যায় । টুরিস্ট ভিসা চালু হলে পরিবার নিয়ে সহজেই ভারতে বেড়াতে আসতে পারব ।"
চ্যাংরাবান্ধার স্থানীয় দোকানদার রেখা দাস জানান, পর্যটন ভিসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । সেই কঠিন সময়েই স্বামীকে হারিয়েছেন । সংসার চালাতে চরম সংকটে পড়তে হয়েছিল । তাঁর আশা, পর্যটকদের ভিড় ফিরলে ব্যবসাও আবার আগের ছন্দে ফিরবে ।
মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী রুহুল আমিন বলেন, "বাংলাদেশ থেকে পর্যটকদের যাতায়াত বাড়লে শুধু মুদ্রা বিনিময় নয়, হোটেল, রেস্তরাঁ, পরিবহণ-সহ সব ধরনের ব্যবসাই লাভবান হবে। সীমান্ত এলাকার অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।"
একই ছবি উত্তর 24 পরগনার পেট্রাপোল স্থলবন্দরেও । দীর্ঘদিন পর্যটন ভিসা বন্ধ থাকায় কার্যত তলানিতে ঠেকেছিল বন্দরের ব্যবসা । যাত্রী কমে যাওয়ায় পরিবহণ, মানি এক্সচেঞ্জ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শ্রমিক-প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল । প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার মানুষের জীবিকা সংকটে পড়ে ।
পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণার পর খুশির হাওয়া বইছে পেট্রাপোলে । পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, "দেশের স্বার্থে সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা তা মেনে নেব । তবে এটা ঠিক, পর্যটন ভিসা বন্ধ থাকায় সীমান্তের ব্যবসা তলানিতে নেমে গিয়েছিল । এখন ভিসা চালু হলে দুই দেশের সম্পর্ক যেমন আরও মজবুত হবে, তেমনই ব্যবসা ও কর্মসংস্থানও বাড়বে ।"
বাংলাদেশ থেকে আসা কয়েকজন যাত্রীরও দাবি, এতদিন মেডিক্যাল ভিসা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হতো । জরুরি প্রয়োজন থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ে ভারতে আসা সম্ভব হতো না । পর্যটন ভিসা চালু হলে যাতায়াত সহজ হবে । পাশাপাশি তাঁরা ভিসা প্রক্রিয়া আরও সরল করারও দাবি জানিয়েছেন ।
রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনীয়া বলেন, "ভারত সবসময় প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায় । বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করেই পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু করা হচ্ছে । এর ফলে সীমান্ত এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য আরও বৃদ্ধি পাবে ।"
সীমান্তবাসীদের মতে, পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু হওয়ার ফলে শুধু দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগই বাড়বে না, উত্তরবঙ্গের চ্যাংরাবান্ধা থেকে দক্ষিণবঙ্গের পেট্রাপোল- সমস্ত সীমান্ত এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহণ, হোটেল শিল্প এবং স্থানীয় অর্থনীতিও নতুন প্রাণ ফিরে পাবে । এখন নজর 28 জুনের দিকে । ঘোষণার পর বাস্তবে কত দ্রুত স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের যাতায়াত, সেটাই দেখার ।