• বিপর্যয় নামে কি ত্রিফলা আঁতাঁতেই? হেফাজতে কালী, মৃত বেড়ে ১৬
    এই সময় | ২৭ জুন ২০২৬
  • এই সময়: তারাতলা–বিপর্যয়ের পরে কেটে গিয়েছে ৬০ ঘণ্টা। প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। আর উদ্ধারকারী দলের মধ্যে বাড়ছে দুশ্চিন্তাও— আরও কেউ কি চাপা পড়ে রয়েছেন ২বি ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডের ওই গোডাউনের ধ্বংসস্তূপের নীচে? বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকালের মধ্যে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নতুন করে তিন জনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। আর হাসপাতালে ভর্তি গুরুতর আহতদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে আরও দু’জনের।

    ফলে সব মিলিয়ে এ দিন মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬–তে। এ দিনও রাত পর্যন্ত কংক্রিটের চাঙড়, লোহার বিম, অ্যালুমিনিয়ামের শিট সরিয়ে উদ্ধারকাজ জারি রয়েছে। কিন্তু কর্মরত শ্রমিকদের কোনও রেজিস্টার না–থাকা এবং তারাতলার বিপর্যয়ে লেবার সাপ্লায়ার ও সুপারভাইজ়ার— দু’জনেরই মৃত্যু হওয়ায় ঘটনার সময়ে অকুস্থলে ঠিক ক’জন ছিলেন, তা নিয়ে স্পষ্ট কোন‍ও ধারণা এখনও নেই উদ্ধারকারী দলের কাছে।

    এই রেজিস্টার খাতা মেনটেন না–করাটা যেমন একটা বড় গাফিলতি হিসেবে উঠে এসেছে পুলিশি তদন্তে, তেমনই এই প্রশ্নটা জোরালো হয়েছে যে— এই গাফিলতি ইচ্ছাকৃত ছিল কি না। সেই সূত্রেই কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়রের ওএসডি ধৃত কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মূল লিজ়–হোল্ডার সংস্থা ‘বেহরা ব্রাদার্স’ ও নির্মাণকারী সংস্থা ‘অয়ন ট্রেডার্স’ এবং পুরসভার ইঞ্জিনিয়ার–আধিকারিকদের একাংশের মধ্যে ত্রিফলা আঁতাঁত ছিল কি না, সে দিকে নজর রয়েছে তদন্তকারীদের।

    প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের তৎকালীন ওএসডি কালীচরণকে এ দিন আলিপুর আদালতে তোলা হলে বিচারক ৪ জুলাই পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। ‘বেহরা ব্রাদার্সে’র অন্যতম মালিক শম্ভুনাথ বেহরা–সহ আরও পাঁচ জনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ নকশা পুরসভা থেকে পাশ করানো এবং তার ভিত্তিতে নির্মাণ চলাকালীন কী ভাবে প্রতি পদে নিয়ম ভাঙা হয়েছে, এর পিছনে আর কার কার যোগ ছিল— তা জানতে ধৃতদের মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা হচ্ছে। আপাতত ত্রিফলা–ষড়যন্ত্রের রহস্যভেদ করতে কালীচরণ ও লিজ়–হোল্ডার সংস্থার কর্তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু পুরসভার কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ারও যে ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না, সে কথা বৃহস্পতিবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পুলিশও ইতিমধ্যে পুরসভার কাছ থেকে বেশ কিছু নথি চেয়ে পাঠিয়েছে। সেই নথিপত্র এলেই পুর–আধিকারিকদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে।

    এ দিন দুপুরে কালীচরণকে কোর্ট লকআপে আনা হয়। বিজেপি–পন্থী কিছু আইনজীবী তাঁর শাস্তির দাবিতে কোর্ট চত্বরে বিক্ষোভ দেখান। বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ মামলার শুনানি শুরু হলে সরকারি কৌঁসুলি সৌরীন ঘোষাল দাবি করেন, ‘টিম ওয়ার্ক করে বেআইনি ভাবে বিল্ডিং প্ল্যানের অনুমোদন পাইয়ে দিতেন কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মাথায় কার হাত রয়েছে, তাঁর রক্ষাকর্তা কে, সেটা আমাদের জানতে হবে। কালীচরণ প্রভাবশালী। হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে প্রয়োজন।’ তাঁর আরও দাবি, ‘যে বিল্ডিং প্ল্যানের অনুমোদন পাওয়া যেত না, সেগুলোকে টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে অনুমোদন পাইয়ে দিতেন কালী।

    এই টিমে কারা রয়েছেন, তাঁদের বিষয়েও জানতে হবে।’ সৌরীনের সংযোজন, ‘প্রভাব খাটিয়ে টাকার বিনিময়ে ত্রুটিপূর্ণ প্ল্যান অনুমোদনে সাহায্য করেছিলেন কালীচরণ।’ শুধু তারাতলার এই গোডাউন নয়, অন্য যে সব নির্মাণেও প্রশ্ন বা সংশয় তৈরি হতো, সেখানেও প্ল্যান পাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকত কালীচরণের। যদিও ধৃতের আইনজীবীর পাল্টা যুক্তি, ‘এফআইআর–এ নাম ছিল না। আমার মক্কেল কোনও ভাবেই জড়িত ছিলেন না। সব নথি পাবলিক ডোমেনেই রয়েছে। তা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃত ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ দু’পক্ষের সওয়াল–জবাবের পরে ৪ জুলাই পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয় আদালত।

    পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০৩–এ ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে প্রথমে রেভিনিউ সার্ভিসে যোগ দেন তিনি। তার তিন বছর পরে ২০০৬–এ আবারও ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৮–এ রাজ্য পুলিশ সার্ভিসে যোগ দেন তিনি। তবে প্রশিক্ষণের সময়ে সেই চাকরি ছেড়ে দেন। ২০০৯–এ মিউনিসিপ্যাল সার্ভিস কমিশনের ডেপুটি ম্যানেজার নিয়োগের পরীক্ষায় প্রথম হন। তখন তিনি যোগ দেন কলকাতা পুরসভার ৯ নম্বর বরোর সমাজকল্যাণ বিভাগের আধিকারিক হিসেবে। ঘটনাচক্রে তখন ওই বরোর চেয়ারম্যান ছিলেন ফিরহাদ হাকিম। একাধিক পুর আধিকারিক জানান, তখন থেকেই ফিরহাদ ও কালীর ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাত। ২০১৮–তে ফিরহাদ মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর আগের মেয়রের ওএসডিকে রাতারাতি অর্ডার জারি করে বদলি করা হয়েছিল মৌলালি ওয়ার্কশপে। নতুন মেয়রের ওএসডি হিসেবে পুরসভার সদর দপ্তরে জায়গা করে নেন কালীচরণ। অভিযোগ, তাঁকে না টপকে মেয়র ফিরহাদের কাছে কেউ পৌঁছতে পারতেন না। ঠিক একই কথা বৃহস্পতিবার শোনা গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর মুখেও।

    কলকাতা পুরসভার ‘টক–টু–মেয়র’ অনুষ্ঠানের সময়ে তৎকালীন মেয়র ফিরহাদের পাশে দেখা যেত কালীচরণকে। অনেকেই নানা সমস্যা নিয়ে ফোন করতেন লাইভ অনুষ্ঠানে। অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধানের নামে কালীচরণ ওরফে কালী প্রভাব খাটিয়ে পরোক্ষ ভাবে টাকা তোলার পথ খুঁজে নিতেন। এহেন কালীকে গ্রেপ্তারির পরে পুলিশ দাবি করেছে, কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে লিজ় ‍নেওয়া জমিতে যে ন‍ির্মাণকাজ চলছিল, তার প্ল্যান নিয়ম ভেঙে অনুমোদনের ক্ষেত্রে কালীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। টাকার বিনিময়ে প্ল্যান পাশ করতে সাহায্য করেছিলেন তিনি। কার কার সঙ্গে ‘টিম ওয়ার্ক’ করে তিনি বেআইনি কারবার চালাতেন, সেটাই এখন জানতে চাইছেন তদন্তকারীরা।

    কলকাতা পুলিশের সিটের তদন্তকারীরা এখন হাসপাতালে ভর্তি থাকা আহত ব্যক্তিদের সঙ্গেও কথা বলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইতিমধ্যে চিকিৎসাধীন দু’জনকে এসএসকেএম হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে কথা বলেই জানার চেষ্টা হবে, ঠিক কত জন ঘটনার সময়ে কাজ করছিলেন, তাঁদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল কি না, কেন রেজিস্টার খাতা মেনটেন করা হতো না, শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও কারও চাপ ছিল কি না ইত্যাদি নানা বিষয়। অকুস্থলে থাকা ব্যক্তিদের মোবাইলও খতিয়ে দেখবেন তদন্তকারীরা। ইতিমধ্যে যাঁরা ঘটনার সময়ে বাইরে টিফিন খেতে বেরিয়েছিলেন, সে রকম তিনজনের বয়ান নেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের খবর। এ রকম আরও কয়েকজন রয়েছেন। তাঁদের তালিকাও তৈরি করা হচ্ছে।

  • Link to this news (এই সময়)