• রাম মন্দির দান কেলেঙ্কারি: কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি কি সত্যি? কী চলছে অযোধ্যায়?
    এই সময় | ২৭ জুন ২০২৬
  • কোটি কোটি ভক্তের গভীর আস্থার জায়গা অযোধ্যার রাম মন্দির। আর এই মন্দিরেই দান হিসেবে আসা অর্থ ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী চুরির গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে গোটা দেশে এখন তোলপাড় চলছে। শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপড়েন। SIT-র প্রাথমিক তদন্ত ও FIR-এর পরে পদত্যাগ করেছেন ট্রাস্টের জেনারেল সেক্রেটারি চম্পত রাই ও ট্রাস্টি অনিল মিশ্র। এখনও পর্যন্ত ৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এই তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। সব মিলিয়ে এক গভীর সঙ্কটে শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট, কী চলছে অযোধ্যায়?

    জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে এই ঘটনার সূত্রপাত। CCTV ক্যামেরায় মন্দিরের এক কর্মীকে দান গণনার সময়ে নগদ টাকার বান্ডিল লুকতে দেখা যায়। সেই ফুটেজ প্রকাশ্যে আসার পরেই সমাজবাদী পার্টির নেতা তথা প্রাক্তন স্থানীয় বিধায়ক, পবন পাণ্ডে মন্দিরের ভিতরে চরম অনিয়ম চলছে বলে অভিযোগ করেন।

    দীর্ঘ সময় ধরে মন্দিরের দানবাক্স থেকে চুরি চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। দাবি করেন, নগদ অর্থ, সোনা ও রুপোর অলঙ্কার-সহ প্রায় ৭-৭.৫ কোটি টাকার সামগ্রী নয়ছয় করা হয়েছে। আপ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালদের মতো বিরোধীরা দাবি করেছে, নয়ছয়ের প্রকৃত পরিমাণ আরও অনেক বেশি, অন্তত ২০০ কোটি টাকা।

    বিস্ময়কর হলো, Indian Express-এর রিপোর্ট অনুসারে, ২০২০ সালের একটি অডিট রিপোর্টে ট্রাস্টের বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের নিয়োগ পদ্ধতিকে ‘অত্যন্ত অপেশাদার’ বলা হয়েছিল। দানের সিস্টেমেটিক রেকর্ড না থাকা, কোনো SOP না থাকা এবং যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মীর অভাবের কথা উল্লেখ ছিল।

    সতর্ক করা হয়েছিল, কোনো সঠিক SOP বা অডিট ট্রেইল ছাড়া কোটি কোটি টাকার অনুদান পরিচালিত হলে ভয়াবহ চুরির ঝুঁকি তৈরি হবে। ট্রাস্ট সেই অডিট রিপোর্টকে পাত্তা দেয়নি।

    কর্তৃপক্ষের গাফিলতি এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, মন্দিরের দানবাক্সের চাবি ছিল চম্পত রাইয়ের প্রাক্তন ড্রাইভারের কাছে—মন্দিরের প্রশাসনিক পদের সঙ্গে যার কোনও সম্পর্কই ছিল না।

    পবন পাণ্ডের মতো ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে অভিযোগ করলেও সেই সময়ে উত্তরপ্রদেশ সরকার বা পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো স্বতঃপ্রণোদিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অবশেষে, ১৪ জুন ট্রাস্টের অনুরোধে এই অভিযোগের তদন্তে SIT গঠন করে উত্তরপ্রদেশ সরকার।

    এরপর SIT-এর প্রাথমিক রিপোর্টের ভিত্তিতে ট্রাস্ট সদস্য কৃষ্ণ মোহন পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেন, যার ভিত্তিতে ২৫ জুন রাতে রাম জন্মভূমি থানায় FIR দায়ের হয়। তৎপরতা দেখিয়ে পরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই FIR-এ অভিযুক্ত ৮ জনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

    ধৃতদের মধ্যে ৬ জনেরও বেশি সরাসরি দান গণনা, হ্যান্ডলিং ও সংরক্ষণের কাজে যুক্ত ছিলেন। চম্পৎ রাইয়ের প্রাক্তন ড্রাইভার রামশঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নু যাদবও রয়েছেন গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে।

    ধৃতদের কাছ থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৭৯.৮৫ লক্ষ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে এবং তাদের ২৯ জুন পর্যন্ত জুডিশিয়াল কাস্টডিতে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সে দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সারা দেশ।

    তবে এই তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অরবিন্দ কেজরিওয়াল থেকে শুরু করে শঙ্করাচার্য স্বামী অবিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতী পর্যন্ত মনে করছেন, রাঘব বোয়ালদের আড়াল করতে চুনোপুঁটিদের ধরছে SIT।

    শঙ্করাচার্য স্বামী অবিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতী ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশের নিন্দা করে বলেন, ‘মন্দিরের ট্রাস্ট ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আপনারা ধর্মীয় নেতাদের সরিয়ে দিয়ে নিজস্ব কর্মীদের দিয়ে ট্রাস্ট বানিয়েছেন, যার ফলে স্বচ্ছতা পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে।’

    রাম মন্দিরের এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি। আগামী বছরেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে এই রকম বিষয় বিরোধী দলগুলি ছেড়ে দেবে না, তা বলাই বাহুল্য।

    সমাজবাদী পার্টি, কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলি ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে ‘ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে প্রচার শুরু করে দিয়েছে। শুক্রবার যে ‘নৈতিক দায়িত্ব’ স্বীকার করে পদত্যাগ করেছেন চম্পৎ রাই এবং অনিল মিশ্র, তা-ও এই ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।

    বিপর্যয় সামাল দিতে ট্রাস্ট এখন নতুন করে প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের চিন্তা করছে। শোনা যাচ্ছে, মন্দিরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একজন পূর্ণকালীন CEO নিয়োগ করা হতে পারে। SIT-র চূড়ান্ত রিপোর্টেও মন্দির পরিচালনার জন্য নতুন ও কঠোর নিয়মবিধির সুপারিশ থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

    আসলে এই ঘটনায় মন্দির ট্রাস্টের পাশাপাশি যোগী সরকারের ‘সুশাসন’ ও ‘স্বচ্ছতা’র দাবিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের। যা নির্বাচনী সমীকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁদের মতে, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং ভক্ত তথা ভোটারদের আস্থা ফিরে পাওয়া।

  • Link to this news (এই সময়)