নয়া পাঠ্যবই, নয়া বিতর্ক। নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান পাঠ্যবইতে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে চাপানউতোরের মধ্যেই সামনে এল নয়া তথ্য। ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি) সংশোধিত নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) অন্তর্ভুক্ত করেছে।
পাঠ্যপুস্তকে ভুয়ো খবর, ভুল তথ্য এবং ভয়ভীতির মতো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনার জন্য ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) প্রশংসাও করা হয়েছে। বইয়ে রাখা হয়নি সংবিধানের প্রস্তাবনাও! ফলে ‘সার্বভৌম’, ‘সমাজতান্ত্রিক’, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’-র মতো শব্দের ব্যাখ্যাও বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। তা নিয়ে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে বিতর্ক। এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে। তা সত্ত্বেও এভাবে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করায় সমালোচনা করেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। পক্ষান্তরে এনসিইআরটি-র সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বিজেপি।
বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিহারে এসআইআর প্রক্রিয়া চালু হওয়ার এক বছর পর এই অন্তর্ভুক্তি ঘটল। এই প্রক্রিয়াটি পরবর্তীকালে ১৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে প্রসারিত হয়েছে। তার ফলে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ছ’কোটি নাম বাদ পড়েছে। জন্ম দিয়েছে রাজনৈতিক বিতর্কের। বিরোধী দলগুলি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নাগরিকদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ তুলেছে। এই আবহে নবম শ্রেণির পাঠ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে একটি অংশ, যার শিরোনাম- ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি: ইন্ডিয়া অ্যান্ড বিয়ন্ড’। তাতে লেখা রয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশন বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রমও পরিচালনা করে, যার আওতায় ভোটার তালিকা যাচাই এবং সংশোধন করা হয়।
এসআইআর-এর মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করে যে, কোনও যোগ্য নাগরিক যেন বাদ না পড়েন এবং কোনও অযোগ্য ব্যক্তি যেন ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হন। এই প্রক্রিয়াটি সমস্ত ভোটারের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে, বিশেষত সেইসব তরুণ ভোটারদের, যাঁরা সবেমাত্র ১৮ বছর পূর্ণ করেছেন এবং সচেতনতার অভাব বা অন্য কোনও কারণে বাদ পড়তে পারেন। নির্বাচন কমিশন সংশোধিত ভোটার তালিকার বিরুদ্ধে দাবি বা আপত্তি উত্থাপনের জন্য সময় দেয় এবং চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের আগে এই দাবি ও আপত্তিগুলি নিষ্পত্তি করে।’ আগের নবম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে নির্বাচনী রাজনীতি বিষয়ক অধ্যায়ে শুধু উল্লেখ ছিল যে, ‘প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ভোটার তালিকার সম্পূর্ণ সংশোধন করা হয় এবং এটি করা হয় তালিকাটিকে আপ টু ডেট রাখার জন্য।’
সংশোধিত অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ‘বিভিন্ন অঞ্চল ও ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা ৯৬.৮ কোটিরও বেশি যোগ্য ভোটারের কারণে ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়া বিশ্বের অন্যান্য অংশের চেয়ে অতুলনীয় ও স্বতন্ত্র।’ এতে আরও বলা হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) এই বিশাল কার্যক্রমটি স্বায়ত্তশাসিতভাবে পরিচালনা করে এবং সারা দেশে নির্বাচন যাতে অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও, ইসিআই একাধিক স্তরে নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার চেষ্টা করে। বিহার, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় থেকেই কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছিল বিরোধী দলগুলি। সেই ধারা বজায় রেখেই নয়া পাঠ্যসূচির সমালোচনা করেছে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস।
কংগ্রেস নেতা কে সি বেণুগোপাল বলেন, এনসিইআরটি ‘ইতিহাস বিকৃত করার’ এবং ছাত্রদের মনে ‘বিষাক্ত’ বিষয় ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য বিজেপির একটি শাখায় পরিণত হয়েছে। তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়ের দাবি, “আমরা নির্বাচন কমিশনের কাজ নিয়ে অনেক অভিযোগ করেছিলাম। পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে এসআইআর হল, তাতে ২৭ লক্ষ ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এটা অন্যায় ছিল। পাঠ্যপুস্তকে এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার আমরা তীব্র নিন্দা করছি।”