• বাড়ি থেকে পালিয়ে পাহাড় চূড়ায় ‘অ্যাডভেঞ্চার’, তিন বন্ধুর কাণ্ড সিনেমাকেও হার মানাবে
    এই সময় | ২৮ জুন ২০২৬
  • ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলে জাম আর জামরুলের পাতায় অল্প হাসির মতো লেগে থাকা রোদ্দুর হতে চেয়েছিল অমলকান্তি। সে রোদ্দুর হতে পারেনি। তবে ছকভাঙা এক ইচ্ছার জন্যেই আজও অমলকান্তি অনেকের কাছেই প্রিয়। ধরা-বাঁধা জীবনকে তুড়ি মেরে উল্টো পথে হাঁটতে শেখায় সে। অনেকটা সে ভাবেই উল্টো পথে হেঁটেছিলেন কেরালার তিন কিশোর। বদ্ধ ঘরে না থেকে, জগৎটাকে দেখার টানে বেরিয়ে পড়েছিলেন বাড়ি থেকে। তিন বন্ধু মিলে ‘বাসা’ বেঁধেছিল পাহাড়ি জঙ্গলে। কিন্তু, থানা পুলিশের চোখ এড়িয়ে সে সুযোগ আর মিলবে কতদিন? বাড়ি ফিরতেই হলো। মুক্তির স্বাদটুকু নিয়ে।

    কেরালার কোঝিকোড়ের বাসিন্দা ওই তিন বন্ধু। একই স্কুলের পড়ুয়া। তিনে মিলে প্ল্যান করে। স্কুলে যাওয়ার নাম করেই বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ি থেকে বের হয় সকলে। পরিকল্পনামাফিক যাত্রা শুরু হয়। স্কুলের পথ না নিয়ে তিন জনে ওয়েনাড়ে ভাদুভানচাল এলাকার চিত্রগিরির কাছে গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করে। সেখানেই তাঁবু খাঁটিয়ে রাত্রিযাপন।

    কী করে থাকবে, কী খাবে? সব পরিকল্পনা ছিল আগে থেকেই। নিজেদের সঙ্গে ত্রিপল, চাল, রুটি, একটি ছুরি এবং রান্নার পাত্র— সবই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল ওই তিন বন্ধু। সঙ্গে ছিল কিছু নগদ অর্থও। নিজেদের মোবাইল বিক্রি করে সেই অর্থ জোগাড় করে তারা। ফোন বিক্রির ১০ হাজার টাকা নগদ, বাকি জিনিসপত্র নিয়ে শুরু হয় ‘অন্তরাল’ যাত্রা।

    তিন জনের বয়স ১৫ থেকে ১৬-র মধ্যে। ম্যাচিওরিটি না থাকলেও বুদ্ধি প্রখর। তিন জনের কাছে মোট চারটি মোবাইল ছিল। দু’টি মোবাইল বিক্রি করলেও বাকি দু’টি মোবাইল নিজেদের কাছে রেখে দেয়। তবে সুইচড অফ করে। যাতে নেটওয়ার্ক ট্রেস না করা যায়। পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। লোকালয় থেকে অনেক দূরে প্রায় পাঁচ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত একটি পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে তাঁবু খাটিয়ে থাকে তিন জনে।

    বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা হতে না হতেই হইচই পড়ে যায় তিন জনের পরিবারের। চিন্তিত পরিবারের লোকজন পুলিশের দ্বারস্থ হন। কাউকে অপহরণ করা হয়নি, মুক্তিপণ চেয়ে কোনও ফোন আসেনি। তিন বন্ধু মিলে গেল কোথায়? ফোন বন্ধ দেখে চিন্তা বাড়তে শুরু করে পুলিশেরও। তিন জন যে একসঙ্গে রয়েছে, সে ব্যাপারেও প্রাথমিক ভাবে নিশ্চিত ছিল না পুলিশ।

    ভাগ্যের ফের ছিল। স্কুল থেকে বেশ কিছুটা দূরে তিন জনকে দেখে সন্দেহ হয়েছিল রাস্তার ধারে থাকা এক শ্রমিকের। তিনজনের ছবি তুলে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন তিনি। সেই ছবি পুলিশ প্রথমে নিশ্চিত হয়, তিনজনের গন্তব্য একই। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ খুঁটিয়ে দেখে লাক্কিদি ঘাট পার হয়ে ওয়েনারের দিকে তাদের যাওয়ার বিষয়টি শনাক্ত করে। রাতভর শুরু হয় গোটা এলাকা জুড়ে তল্লাশি।

    এই ঘটনার শেষ পর্বে তিন জনকে খুঁজে পাওয়ার ঘটনাও যে কোনও সিনেমাকে হার মানাতে পারে। ‘হাইড অ্যান্ড সিক’ খেলায় কালঘাম ছুটেছে পুলিশের। পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা এবং অভিভাবকরা মিলে জঙ্গলে তল্লাশি শুরু করেন। শুক্রবার রাত আটটার দিকে স্থানীয়রাই প্রথমে একজনের খোঁজ পান। পুলিশের আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাকি দু’জন একটি স্কুটারে চড়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু স্থানীয়রা তাদের ছাড়ার পাত্র ছিলেন না। তাঁরা নিজেদের গাড়িতে করে তাদের ধাওয়া করেন। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে পাডিভিয়ালের কাছে ওই দু’জনকে আটক করা হয়। তিন জনকে নিয়ে যাওয়া হয় মেপ্পাদি থানায়। সেখানে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ​​ছেড়ে দেওয়া হয়।

    ‘ঘরবন্দি’ জীবন থেকে মুক্তি পেতেই তিন জনের এই প্ল্যান বলে পুলিশকে জানিয়েছে তিন জন। প্রত্যেকেরই মা-বাবাকে জানানো হয়েছে, তিন জনের কাউন্সেলিং করার জন্য। স্বস্তিতে প্রত্যেকের অভিভাবকরা। তবে ওই তিন কিশোর কি আবার ‘লুকোচুরি’ খেলবে?

  • Link to this news (এই সময়)