বিশেষ ভৌগলিক পরিচিতি বা জিআই তকমা প্রাপ্তিতে একযোগে এক জেলার তিন সম্পদ! হুগলির মুকুটে স্রেফ নতুন পালক নয়, যেন মূল্যবান রত্ন যুক্ত হল। একসঙ্গে চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ, জনাইয়ের মনোহরা ও বলাগড়ে নৌকা জিআই ট্যাগ পাওয়ার আনন্দে উদ্বেল হুগলিবাসী। তার চেয়েও বেশি খুশি মিষ্টি নির্মাতা, নৌ-গবেষক ও শিল্পীরা। সকলেই বলছেন, দীর্ঘ লড়াইয়ের স্বীকৃতি এই প্রাপ্তি। এখন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে তাঁদের চাওয়া, জলভরা, মনোহরা আর ডিঙি নৌকার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ুক আন্তর্জাতিক স্তরেও।
মিষ্টিপ্ৰিয় বাঙালির কাছে জলভরা সন্দেশের বিকল্প নেই। কড়া পাকের সন্দেশের বাইরের অংশ খাওয়ার পর ঠিক তার পেটের যে টলটলে গুড়ের রস – তা তো অমৃত সমান! এমন স্বাদ যে না গ্রহণ করেছে, সে সত্যিই বঞ্চিত। এমন সুস্বাদু মিষ্টান্ন তৈরির জন্য চন্দননগরের সূর্য মোদকের খ্যাতি দিকে দিকে। এমনকী গত ২০ জুন প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করতে আসা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল এই জলভরা সন্দেশ। আজ যে এই মিষ্টি জিআই ট্যাগ পেয়েছে, সেই আনন্দ উদযাপনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও করে ফেলেছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রতিষ্ঠানের তরফে শৈবাল মোদক বলেন, ‘‘চন্দননগরের জলভরা সন্দেশের সর্বভারতীয় স্তরে একটা সুনাম রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই মিষ্টি ব্যবসার জন্য জিআই তকমা পাওয়া প্রয়োজন ছিল। আমরা খুবই আনন্দিত। ২০২২ সালে সেপ্টেম্বর মাসে আমরা জিআই-এর জন্য আবেদন জানাই। দীর্ঘ চার বছর বাদে এই স্বীকৃতি পেয়েছি। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যম দিয়ে এই মিষ্টি জিআই তকমার পরীক্ষায় পাশ করেছে। সূর্য মোদকের জলভরা এখন থেকে চন্দননগরের জলভরা হিসেবেই পরিচিতি পাবে আগামী দিনে। আমরা চাই, চন্দননগরে সূর্য মোদকের একটা মূর্তি স্থাপন করতে। তার জন্য বিধায়কের কাছে আবেদন জানিয়েছি। আন্তর্জাতিক বাজারে জলভরা প্রসার ঘটাতে গেলে মিষ্টির মেয়াদ বাড়াতে হবে। এর জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিয়ে রিসার্চ করতে হবে। তবেই জলভরা সন্দেশ বিদেশের বাজারে মর্যাদা পাবে। ব্যবসার দিক খুলবে।”
অন্যদিকে, জিআই তকমা পেয়েছে বলাগড়ের নৌশিল্পও। এনিয়ে গবেষক পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘বলাগড়ের নৌশিল্পের জিআই পাওয়াটা প্রায় চার বছরের একটা লড়াই। সারা ভারতবর্ষে সমস্ত জায়গায় নৌকা বানানো হয়। সুন্দরবন কাকদ্বীপ ও জলপাইগুড়িতে নৌকো বানানো হয়, কিন্তু বলাগড়ের নৌশিল্প অন্য রকম। সেই ইতিহাসকে ও বিভিন্ন তথ্যের মাধ্যমে সাহায্য করেছিলেন অধ্যাপক ডক্টর পিনাকি ঘোষ ও ডক্টর শান্তনু পান্ডা।আইনগতভাবে গবেষণাপত্র করে জমা দিতে হয়। সেইমতো পাঁচবার শুনানির পর বলাগড়ের ডিঙি নৌকা স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা বোঝাতে পেরেছি, নৌকার প্রথম ধাপ ছিল ডিঙি নৌকাই।”
এক নৌশিল্পীর কথায়, ‘‘জিআই পাওয়ায় ফলে ভারতবর্ষের মানচিত্রে একটা জায়গা পেলাম, তাতে আমরা খুশি। কিন্তু আর্থিকভাবে কতটা লাভবান হলাম, তা বলতে পারব না। আমাদের নৌকা প্রধানত ব্যবহার করা হয় মৎস্যজীবী মানুষের জন্য। তারাও আর্থিকভাবে দুর্বল। সেই কারণে আমরাও নৌকার উপযুক্ত দাম পাচ্ছি না। এমনকি নৌশিল্পীরাও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারছে না। জিআই পাওয়া স্বীকৃতি কিন্তু আমাদের সরকারি সাহায্য যদি না পাই তাহলে আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন বিপন্ন হয়ে যাবে আগামী দিনে।”